প্রকাশ: ২৯ জুলাই, ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক বন্দুক হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পুলিশ কর্মকর্তা দিদারুল ইসলাম রতন। নিউইয়র্ক সিটির প্রাণকেন্দ্র ম্যানহাটনের একটি বহুতল অফিস ভবনে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় দিদারুলসহ চারজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে সন্দেহভাজন বন্দুকধারীও রয়েছেন। স্থানীয় সময় সোমবার, ২৮ জুলাই সন্ধ্যায় এ ঘটনাটি ঘটে, যা নিউইয়র্কবাসীসহ প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে চরম শোক ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
নিহত দিদারুল ইসলামের আদি বাড়ি বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার পৌর শহরের মাগুরা এলাকায়। তার পিতা আব্দুর রব এবং মাতা মিনারা বেগম। পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও বাংলাদেশি সমাজের সঙ্গে তাদের গভীর সম্পর্ক ছিল বলেই জানিয়েছেন পরিচিতজনেরা।
নিউইয়র্ক সিটির মেয়র এরিক অ্যাডামস ঘটনার পর এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, ম্যানহাটনের মিডটাউনে একটি অফিস কমপ্লেক্সে সশস্ত্র হামলায় অন্তত পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হন, যাদের মধ্যে চারজনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, নিহত পুলিশ কর্মকর্তা দিদারুল ইসলাম নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টে (NYPD) তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে কর্মরত ছিলেন এবং তিনি একজন বাংলাদেশি অভিবাসী ছিলেন। মেয়র অ্যাডামস বলেন, “তিনি কেবল একজন সাহসী পুলিশ কর্মকর্তা নন, একজন সুশৃঙ্খল অভিবাসী প্রতিনিধি, যিনি এই শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন।”
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হামলাটি সংঘটিত হয় স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটের দিকে। সন্দেহভাজন হামলাকারী একজন সাবেক কর্মচারী, যিনি ভবনের ১৪ তলায় প্রবেশ করে একটি কনফারেন্স কক্ষে এলোপাথাড়ি গুলি চালান। সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে, তবে ততক্ষণে রক্তাক্ত হয়ে পড়ে পুরো চত্বর। সেসময় দায়িত্বরত অবস্থায় ছিলেন অফিসার দিদারুল ইসলাম, যিনি হামলাকারীর গুলিতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।
দিদারুলের দীর্ঘদিনের বন্ধু ও নিউইয়র্কে বসবাসকারী বাংলাদেশি কমিউনিটি সদস্য সৈয়দ তানজিব মুজিব ওহী সংবাদমাধ্যমকে জানান, “রতন অত্যন্ত সৎ ও কর্মনিষ্ঠ মানুষ ছিল। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল একজন পুলিশ অফিসার হয়ে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে সে প্রবাসেও নিজের দায়িত্বে কখনও অবহেলা করেনি। আজ তার এই নির্মম মৃত্যু শুধু আমাদের জন্য নয়, পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রতনের মৃত্যুকে ঘিরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিউইয়র্ক ও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থার জোরদারের দাবি তুলেছেন। বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার মাগুরা এলাকাতেও রতনের মৃত্যুর খবরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয়রা জানান, দিদারুল খুবই শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিল এবং এলাকায় তার পরিবার অত্যন্ত সম্মানিত।
এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রে চলমান বন্দুক সহিংসতার আরেকটি নির্মম প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক হামলায় নিহতের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রবাসী ও অভিবাসী পুলিশ সদস্যরা যেমন সাহসিকতার প্রতীক, তেমনি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের কনসুলেট থেকে দিদারুলের পরিবারকে সহযোগিতা এবং মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠানোর বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ (NYPD) জানায়, নিহত কর্মকর্তার প্রতি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ শ্রদ্ধা জানানো হবে এবং তার স্মরণে যথাযথ আনুষ্ঠানিকতা পালিত হবে।
আজ রতনের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো, বাংলাদেশি প্রবাসীরা কেবল অর্থনীতির নয়, বরং বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে মানবিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও সামনের সারিতে রয়েছে। তার জীবন ছিল একজন অভিবাসীর স্বপ্নপূরণের উদাহরণ, আর মৃত্যু এক নির্মম বাস্তবতার চিত্র—যেখানে দায়িত্বপালনের পথেই তাকে জীবন দিতে হলো।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন