প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
শিক্ষাক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অভাবনীয় অগ্রযাত্রা যেমন একদিকে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে, তেমনি তা নিয়ে গভীর উদ্বেগও তৈরি হচ্ছে শিক্ষাবিদ, অভিভাবক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে দিন দিন এআই চ্যাটবটের উপর নির্ভরতা যেমন বাড়ছে, তেমনি তাদের চিন্তাশক্তি ও বিশ্লেষণক্ষমতার বিকাশে ব্যাঘাত ঘটছে কি না, তা নিয়েও চলছে তীব্র বিতর্ক। এরই মধ্যে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই এমন একটি পদক্ষেপ নিয়েছে যা নতুনভাবে ভাবতে শেখানোর ক্ষেত্রে এই বিতর্কের জবাব দিতে পারে।
চ্যাটজিপিটির নতুন ফিচার “স্টাডি মোড”—এমনই একটি উদ্ভাবন, যা ব্যবহারকারীদের সরাসরি উত্তর না দিয়ে ধাপে ধাপে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে। শিক্ষার্থীরা যাতে নিজস্ব বিশ্লেষণ ও যুক্তির মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে পৌঁছায়, সে লক্ষ্যেই এই মোডটি তৈরি করা হয়েছে। ওপেনএআই জানিয়েছে, শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় ফিচারটি ডিজাইন করা হয়েছে এবং এটি সম্পূর্ণ ঐচ্ছিকভাবে চালু করা যাবে।
স্টাডি মোডে ব্যবহারকারীর প্রশ্নের প্রেক্ষিতে সরাসরি উত্তর না দিয়ে সে প্রশ্নের প্রাসঙ্গিক দিকগুলো নিয়ে নতুন প্রশ্ন তোলা হয় কিংবা পরোক্ষ ইঙ্গিত দিয়ে শিক্ষার্থীকে ভাবতে বাধ্য করা হয়। যেমন, দুটি অ্যালগরিদমের মধ্যে কোনটি বেশি কার্যকর—এই প্রশ্নে চ্যাটজিপিটি সরাসরি উত্তর না দিয়ে শিক্ষার্থীকে উল্টো প্রশ্ন করে বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে বলে, ফলে শিক্ষার্থীকে সমস্যাটি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে হয়।
ওপেনএআই এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “চ্যাটজিপিটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় শিক্ষা সহায়ক টুল হয়ে উঠেছে। তবে এর ব্যবহার শিক্ষাক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে—কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে যে এটি শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিক্ষায় সহায়তা করছে, শুধু সমাধান দিয়েই বিষয়টি ধামাচাপা দিচ্ছে না?”
এই উদ্বেগ কেবল তাত্ত্বিক নয়, এর বাস্তব ভিত্তিও রয়েছে। বিখ্যাত প্রযুক্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমআইটি’র মিডিয়া ল্যাব পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা এআই ব্যবহার করে প্রবন্ধ লিখছে, তাদের মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয় থাকে, যাদের চিন্তা-গবেষণায় ভিত্তি হচ্ছে নিজস্ব অনুসন্ধান ও চর্চা। এ থেকে বোঝা যায়, এআই নির্ভরতা যদি মাত্রাতিরিক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে তা শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা গেছে, ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের অন্তত ২৫ শতাংশ ইতোমধ্যেই চ্যাটজিপিটি বা এ জাতীয় এআই টুল ব্যবহার করছে স্কুলের কাজে। আর এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছেই।
এদিকে যুক্তরাজ্যের শিক্ষা তদারকি সংস্থা অফস্টেড সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে জানিয়েছে, “যদি এআই যথাযথভাবে ব্যবহার না করা হয়, তাহলে তা শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে।” এই সতর্কতা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে অনেক অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষা নীতিনির্ধারকদের।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিভাজন স্পষ্ট। লেবার পার্টি এআইকে আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পক্ষে থাকলেও, কনজারভেটিভ পার্টি মনে করে, এমন উদ্যোগে শিক্ষার্থীরা মৌলিক চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে—যা একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—চ্যাটজিপিটি কি হবে শুধু একটি উত্তরদাতা যন্ত্র, না কি হবে একজন দিকনির্দেশক শিক্ষক? ওপেনএআই-এর নতুন ফিচারটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা চায় তাদের প্রযুক্তি হোক জ্ঞানের পথপ্রদর্শক—যে শিক্ষার্থীদের ভাবতে শেখায়, বুঝতে সাহায্য করে এবং প্রয়োগে উৎসাহিত করে।
“স্টাডি মোড” ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী চালু হচ্ছে। এআই নির্ভরতার এই যুগে, হয়তো নতুন করে শিক্ষার্থীদের শেখানো দরকার—তথ্য পাওয়াটাই শেষ কথা নয়, বরং সেই তথ্য দিয়ে ভাবতে, বিশ্লেষণ করতে এবং বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করাই হল সত্যিকার শিক্ষা। এক ক্লিকের দুনিয়ায় এটাই হতে পারে ভবিষ্যতের শিক্ষা বিপ্লবের নতুন যাত্রা।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন