প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের দাবিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটতে চলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং গাজা উপত্যকায় চলমান মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে এবার কানাডা সরাসরি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে। দেশটির নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আসন্ন সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে কানাডা আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে চায়।
মার্ক কার্নির এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে যখন মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলি হামলা, গাজায় ধ্বংসস্তূপের মাঝে বেঁচে থাকা শিশুদের আহাজারি এবং পশ্চিম তীরে দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ক্রমশ বেড়েই চলেছে। প্রধানমন্ত্রী কার্নি বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে আশা করেছিলাম, আলোচনার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান আসবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় স্পষ্ট হচ্ছে, সেই পথ আর কার্যকর নয়। এই পরিস্থিতিতে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়ানো।”
তবে কানাডার এই স্বীকৃতি পুরোপুরি নিঃশর্ত নয়। প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার আনতে হবে। এর অংশ হিসেবে হামাসকে রাষ্ট্রীয় রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়ার শর্ত রাখা হয়েছে। ফিলিস্তিনকে একটি নিরস্ত্রীকৃত, গণতান্ত্রিক ভূখণ্ডে পরিণত করার লক্ষ্যেই এই পরিকল্পনা বলে জানান কার্নি। তাঁর কথায়, “আমরা এমন এক ফিলিস্তিন দেখতে চাই, যেখানে শান্তি থাকবে, সন্ত্রাস নয়; যেখানে ভোট থাকবে, সহিংসতা নয়।”
এ প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “ভবিষ্যতে হামাস ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক কাঠামোতে কোনো স্থান পাবে না। তারা কোনো নির্বাচনেও অংশ নিতে পারবে না।” কার্নির ভাষ্য, “দ্বি-রাষ্ট্র ভিত্তিক সমাধান মানে শুধু ইসরাইলের নিরাপত্তা নয়, ফিলিস্তিনিদের মর্যাদার সঙ্গেও আপস না করা। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য একে অপরের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করা অপরিহার্য।”
কানাডার এই ঘোষণার আগে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। যদিও এসব দেশের ঘোষণায় সময়সীমা বা শর্তাবলী কানাডার মতো নির্দিষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়নি, তবে এটি স্পষ্ট যে পশ্চিমা বিশ্বে ইসরাইলকেন্দ্রিক দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নতুনভাবে পর্যালোচনার মুখে পড়েছে।
তবে এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। একদিকে এটি ফিলিস্তিনের জন্য একটি কূটনৈতিক জয় হিসেবে বিবেচিত হলেও, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে কানাডার এই উদ্যোগকে প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইসরাইলের দীর্ঘদিনের প্রধান মিত্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বরাবরের মতোই বলেছে, এখনই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় নয়। তারা বরং ইসরাইলের নিরাপত্তা ও স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার পক্ষে রয়েছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কানাডার এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে শান্তিপ্রক্রিয়ার নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। তবে তারা একইসঙ্গে সতর্ক করেছেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষকে গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন দূর করা, গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী করা এবং নিরস্ত্রীকরণের প্রতিশ্রুতি পালন করার ওপর নির্ভর করছে এই স্বীকৃতির সফলতা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে গাজা এবং পশ্চিম তীর – দুটি অঞ্চল নিয়েই যে ভবিষ্যতের ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ইসরাইলের দখলদারিত্ব, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সমাধানে শুধু কূটনৈতিক স্বীকৃতিই যথেষ্ট হবে কি না – তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
তবে কানাডার এই স্পষ্ট অবস্থান নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক রাজনীতির মেরুকরণে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শান্তি, ন্যায়বিচার ও সহাবস্থানের পক্ষে দাঁড়ানোর যে বার্তা প্রধানমন্ত্রী কার্নি বিশ্বকে দিয়েছেন, তা হয়তো ভবিষ্যতের ইতিহাসে মধ্যপ্রাচ্যের একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবেই বিবেচিত হবে।