গুলিবিদ্ধ সেই আনারুল এক বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছেন যন্ত্রণা, পাশে দাঁড়ায়নি কেউ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই, ২০২৫
  • ৩৪ বার

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা।একটি বাংলাদেশ অনলাইন

একটি স্বপ্ন ছিল তার—একটি বৈষম্যহীন, মানুষের অধিকারসম্মত বাংলাদেশ। সেই স্বপ্নে আস্থাশীল হয়ে একদিন পথে নামেন আনারুল ইসলাম। কিন্তু স্বপ্নের সে পথেই গুলিবিদ্ধ হয়ে আজও অসহায় এক জীবনের ভার বইছেন তিনি। এক বছর পেরিয়ে গেলেও তার দুঃখ-কষ্ট ভাগ করে নেয়নি কেউ—না রাষ্ট্র, না কোনো মানবাধিকার সংস্থা, এমনকি রাজনৈতিক বা সামাজিক নেতৃত্বও তার জীবনে কোনো সহানুভূতির ছায়া ফেলেনি। গাজীপুরের একটি গার্মেন্টসে কর্মরত এই শ্রমিক আজ দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার এক জরাজীর্ণ ঘরে শুয়ে-বসে সময় কাটান। শরীরে এখনো রয়ে গেছে অন্তত ১০টি রাবার বুলেট, যা তার জীবন ও কর্মক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে।

আনারুল ইসলাম দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার চণ্ডীপুর গ্রামের বাসিন্দা। জীবিকার প্রয়োজনে গাজীপুরের চান্দুরা এলাকায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, স্বৈরাচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে গাজীপুরে আয়োজিত এক ছাত্র-জনতার মিছিলে অংশ নেন তিনি। ছিল না কোনো সংগঠনের দায়িত্ব, ছিল না কোনো পারিশ্রমিক। কেবল বিবেকের তাড়নাতেই রাস্তায় নামা। কিন্তু সেই মিছিলেই পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখান থেকে কোনো চিকিৎসা কাগজ বা রিপোর্ট তাকে দেওয়া হয়নি। ফলে তার চিকিৎসা আর সেখানেই শেষ হয়ে যায়।

পরবর্তীতে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, খানসামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা নিলেও অর্থাভাবে উন্নত কোনো সার্জারি সম্ভব হয়নি। এখনো তার মাথা ও পিঠে গুলি বিদ্যমান। স্বাভাবিক চলাফেরা বন্ধ হয়ে গেছে। আনারুল বলেন, “এতজনকে গুলি খেতে দেখে আর ঘরে বসে থাকতে পারিনি। আমার ভিতরের মানুষটা প্রতিবাদ করেছিল, তাই মিছিলে গিয়েছিলাম। এখন নিজেই বুঝতে পারছি, সেই প্রতিবাদের মাশুল কীভাবে দিতে হয়।”

গোলাগুলির এক বছর পরেও তার জীবনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। একসময় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন আনারুল, এখন তিনি নিজেই হয়ে পড়েছেন পরিবারের বোঝা। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তিনি বলেন, “আমার শরীরে এখনো ১০টা গুলি। কোনো কাজ করতে পারি না। কেউ খবর নেয় না, কেউ পাশে দাঁড়ায় না। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কীভাবে বাঁচব, কিছু বুঝি না। আমার জীবনে এখন শুধু অন্ধকার।”

তার ভাই এরশাদ আলী বলেন, “আমরা তাকে বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করিয়েছি, কিন্তু অপারেশন তো অনেক খরচের ব্যাপার। আমাদের সেই সামর্থ্য নেই। পাটখড়ি ও টিন দিয়ে বানানো একটা ছোট ঘরে এখন সে শুধু শুয়ে-বসে দিন কাটায়। কোনো আয় নেই, কোনো সহায়তা নেই। সরকার বা কোনো সংগঠন এগিয়ে এলে হয়তো সে আবার কিছুটা সুস্থ হতে পারত।”

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি রহিদুল ইসলাম রাফি বলেন, “২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যারা আহত হয়েছেন, তারা কেউ কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়, মানুষের অধিকারের জন্য পথে নেমেছিলেন। তাই রাষ্ট্রের উচিত তাদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা। আনারুল তার জীবনের সর্বস্ব দিয়ে দেশের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন, এখন রাষ্ট্র ও সমাজকে তার পাশে দাঁড়াতে হবে।”

খানসামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও শামসুদ্দোহা মুকুল জানান, “আনারুলের মাথা ও পিঠে ১০টি রাবার বুলেটের অস্তিত্ব আমরা এক্স-রেতে শনাক্ত করেছি। আমরা তাকে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছি, কারণ বুলেট অপসারণ ছাড়াও তার মানসিকভাবে পুনর্বাসনের দরকার আছে। এই অবস্থায় সে দীর্ঘদিন টিকে থাকলে তা তার শরীর ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।”

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খানসামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুজ্জামান সরকার বলেন, “আনারুলের বিষয়টি জানার পর আমরা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তবে যেহেতু তিনি এখনো শরীরে গুলি বহন করছেন, এটি খুবই উদ্বেগজনক। তার উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পুনরায় জানাব।”

আনারুল ইসলামের গল্প শুধুই একজন শ্রমিকের নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্রের মানবিক দায়বদ্ধতার একটি প্রতিচ্ছবি। একটি শ্রেণি যখন রাজনীতির ব্যানারে মাথার উপর ছাতা খুঁজে পায়, তখন আরেক শ্রেণি—যাদের হাতে নেই কিছু, যাদের বুকেই কেবল স্বপ্ন—তারা পড়ে থাকে অবহেলায়, অস্ত্রের ভাষায় গুলিবিদ্ধ হয়ে।

এক বছর হয়ে গেলেও এখনো আনারুলের জীবন থমকে আছে, সেই একই ক্ষত ও গুলিবিদ্ধ যন্ত্রণার মাঝে। তার স্বপ্ন আজ চূর্ণ, তার শরীর রক্তাক্ত, তার পরিবার এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে। সময় এখনো আছে, রাষ্ট্র চাইলে তাকেও ফিরিয়ে আনতে পারে জীবনের মূলধারায়—একটু সহানুভূতি, একটু দায়িত্ব, একটু মানবতা দিয়েই।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত