সাবেক কাউন্সিলর লিপিসহ ১১ জনের গ্রেপ্তার নিয়ে উত্তপ্ত ঢাকা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৪ আগস্ট, ২০২৫
  • ৫৯ বার

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক|একটি বাংলাদেশ অনলাইন

রাজধানী ঢাকায় আবারও আলোচনার কেন্দ্রে পুরনো রাজনৈতিক বলয়ের নেতাকর্মীরা। নিষিদ্ধ ঘোষিত দল আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকার আলোচিত সাবেক নারী ওয়ার্ড কাউন্সিলর সুলতানা আহমেদ লিপি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে চালানো গোপন অভিযানে একযোগে মোট ১১ জন নেতাকর্মীকে আটক করা হয়।

সোমবার সকালে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া মাত্রই রাজধানীজুড়ে শুরু হয় আলোচনা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। এক বছরেরও বেশি সময় আগে নিষিদ্ধ হওয়া সাবেক শাসকদল আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনের উদ্যোগ কিংবা সাংগঠনিক ছায়া সক্রিয় রয়েছে কিনা—সেই প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, গুলশান, খিলগাঁও ও পল্টনসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে রাতভর অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয়েছে পুরনো সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত নেতাকর্মীদের। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা, সংগঠিতভাবে নিষিদ্ধ দলের কার্যক্রম পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা এবং রাজনৈতিক বৈঠকের মাধ্যমে নতুন ষড়যন্ত্রের অভিযোগ রয়েছে।

সুলতানা আহমেদ লিপি এক সময় রাজধানীর প্রভাবশালী নারী রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছাড়াও তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের একটি গুরুত্বপূর্ণ নারী ইউনিটের নেত্রী। অভিযোগ রয়েছে, তার শাসনামলে তিনি রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বিভিন্ন ধরনের অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, জমি দখল ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিক অনুসন্ধান শুরু করলেও সেসব কোনো কার্যকর আইনি পরিণতির মুখ দেখেনি। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এবার প্রথমবারের মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সরাসরি টার্গেটে এলেন তিনি।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া একদিকে যেমন অন্তর্বর্তী সরকারের দৃশ্যমান আইনি সক্রিয়তার নিদর্শন, তেমনি এটি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে—বিশেষ করে সরকারবিরোধী যেকোনো তৎপরতা বরদাশত করা হবে না, তা যত পুরনো বা সুপরিচিত নেত্রীই হোন না কেন। তবে এই বার্তায় যদি পক্ষপাতিত্বের গন্ধ থাকে, তাহলে তা সরকারের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজতাত্ত্বিক অধ্যাপক তানভীর রউফ বলেন, “যে যেই দলেই থাকুক, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়াই কাম্য। তবে এই ব্যবস্থা তখনই ন্যায়ের প্রতিফলন হয়ে ওঠে, যখন তা সকলের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রয়োগ হয়। একপক্ষকে দমন আর অন্যপক্ষকে ছাড় দেওয়ার নীতি আইন বা নৈতিকতার সঙ্গে যায় না।”

অন্যদিকে, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপর দশ নেতাকর্মীর পরিচয় নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা তথ্য ঘুরছে। জানা গেছে, এদের কেউ কেউ আগেও সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সাংগঠনিক মিটিংয়ে অংশ নিয়েছেন এবং বিভিন্ন ফান্ড রেইজিং কর্মসূচির মাধ্যমে রাজনৈতিক পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছেন। এছাড়া, ঢাকার বাইরে একাধিক স্থানে অঘোষিত বৈঠক ও লোকজন জড়ো করার চেষ্টার অভিযোগও তদন্তকারীরা পেয়েছেন।

এদিকে, এই গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর জনগণের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। অনেকেই এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, রাষ্ট্রবিরোধী যেকোনো তৎপরতা রুখে দেওয়া জরুরি। আবার কেউ কেউ সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন—এই অভিযান কি সত্যিই নিরাপত্তা রক্ষার প্রয়াস, নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রকাশ?

এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের বিষয়টি। কারণ অতীতের বহু গ্রেপ্তারে দেখা গেছে, রাজনৈতিক চাপের মুখে অনেকেই পরে জামিনে মুক্ত হয়ে আবার সংগঠনের কার্যক্রমে ফিরে আসেন। যদি এবারও একই চিত্র দেখা যায়, তবে সরকারের আইনি পদক্ষেপ শুধু প্রতীকী হয়ে থাকবে বলেই অনেকে আশঙ্কা করছেন।

এক বছর আগে নিষিদ্ধ ঘোষিত দলগুলোর স্থায়ী কার্যক্রম, নেতৃত্ব ও সম্পদ জব্দ করার ঘোষণা দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু বাস্তবে এখনো পুরনো বলয়ের ছায়া থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়নি রাষ্ট্রীয় কাঠামো। এই গ্রেপ্তার সেই ছায়া দূর করতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপের সূচনা কি না—তা সময়ই বলে দেবে। তবে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বিশ্লেষকরা এককথায় যা বলছেন, সেটি হলো—‘আইনের শাসন তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন তা দল, মত, পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে সবার জন্য সমভাবে প্রয়োগ হয়’।

এখন প্রশ্ন হলো—এই ১১ জনের গ্রেপ্তারে রাজনৈতিক ব্যর্থতার কোনো মূল্যায়ন হবে কি? নাকি পুরনো বলয়ের কিছু চিহ্ন মুছে দেওয়ার মধ্যে দিয়েই সরকার দেখাতে চাইছে, পরিবর্তন চলছে—তবে নির্বাচিত দৃষ্টিতে?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত