শহীদ মিনারে জাতীয় নাগরিক পার্টির ২৪ দফা ঘোষণায় ফের উঠল ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রতিজ্ঞা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৪ আগস্ট, ২০২৫
  • ৬৪ বার

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক ।একটি বাংলাদেশ অনলাইন

এক বছর আগে ঠিক এই দিনে, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের লক্ষ্যে এক দফা দাবি ঘোষণা করেছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। বছর ঘুরে সেই একই স্থানে আবারো দাঁড়ালেন তিনি, তবে এবার শুধু একটি সরকারের বিরুদ্ধে নয়—একটি শাসনব্যবস্থার মূলোৎপাটনের প্রত্যয় নিয়েই। রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত সমাবেশে নাহিদ ইসলাম দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা দেন, “আমরা শুধু একটি ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন চাইনি; আরেক ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার উত্থানের সম্ভাবনা রেখে ঘরে ফিরতেও পারিনি।”

নাহিদ ইসলাম জানান, সরকার পতনের পর তরুণদের নেতৃত্বে যে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে উঠেছে, ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)’, তা কোনও প্রচলিত ক্ষমতার কাঠামোর পুনরাবৃত্তি নয়, বরং একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার সূচনালগ্ন। তিনি বলেন, “রাষ্ট্র ও সমাজে জেঁকে বসা দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্য, দমন-পীড়ন ও একদলীয় কর্তৃত্বের মূলোৎপাটন ছাড়া জনগণের প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয়। তাই আমরা এনসিপি গঠন করেছি, এই সংগ্রামে আপনাদের সঙ্গে থাকতে।”

সমাবেশের প্রধান আকর্ষণ ছিল ‘নতুন বাংলাদেশের ইশতেহার’ শীর্ষক ২৪ দফার ঘোষণা, যেটিকে নাহিদ ইসলাম ‘দ্বিতীয় রিপাবলিক’-এর মূল দলিল হিসেবে অভিহিত করেন। এতে সংবিধান সংস্কার, প্রশাসনিক কাঠামোর ঢালাও পুনর্বিন্যাস, জনগণকেন্দ্রিক উন্নয়ননীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতন্ত্রের ভিত্তিভূমি শক্তিশালীকরণের ব্যাপক রূপরেখা তুলে ধরা হয়। ইশতেহারে যেমন রয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানের বিচার ও স্বীকৃতি, তেমনি আছে নতুন সংবিধানের দাবি, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক সংস্কার, শ্রমিক-কৃষকের অধিকার রক্ষা, টেকসই কৃষি ও পরিবেশ সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি, নারীর অধিকার, স্বাস্থ্যখাতের সুশাসন এবং বহুমুখী বাণিজ্যনীতির কথা।

এনসিপির অন্যতম মুখপাত্র তাসনিম জারা বলেন, “আমরা রাজনীতিতে এসেছি মানুষকে শোনা ও সমস্যার বাস্তব সমাধান দেওয়ার জন্য। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার থেকে শুরু করে প্রতিটি নাগরিক যেন রাজনৈতিক অংশগ্রহণে নিরাপদ বোধ করেন—সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই আমাদের উদ্দেশ্য।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ব, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্যতথ্য একটি নিরাপদ ডেটাবেজে সংরক্ষিত থাকবে। এতে যেমন অপ্রয়োজনীয় টেস্ট বন্ধ হবে, তেমনি সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত হবে। আমরা গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকাগুলোতে প্রাথমিক চিকিৎসার মানোন্নয়নে অগ্রাধিকার দেব।”

সমাবেশে উত্তরের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম আরো এক ধাপ এগিয়ে বলেন, “মুজিববাদী সংবিধান একটি দলীয় চিন্তাধারার প্রতিফলন, যা জনগণের সার্বজনীন মতের প্রতিনিধিত্ব করে না। আমরা সেই সংবিধান ভেঙে নতুন, গণতান্ত্রিক ও বহুস্বরের সংবিধান চাই।” তিনি শহীদ পরিবারগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, “এক বছর আগে যাঁরা এই শহীদ মিনারে ছিল, তাঁদের অনেকেই আজ আর নেই। তাঁদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে, রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার নিশ্চিত করতেই হবে।”

দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন ও হুমকি-ধমকির সময় এখন শেষ। কোথাও কেউ চোখ তুলে তাকালে রাজনৈতিকভাবে তার জবাব দিতে হবে।”

শহীদ মিনারে সমবেত জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এবং বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, এনসিপির ঘোষণাপত্র শুধুই রাজনৈতিক দলীয় কর্মসূচি নয়—এটি অনেকের কাছে একটি বিকল্প রাষ্ট্রচিন্তার বাস্তব রূপরেখা।

এই সমাবেশে উচ্চারিত প্রত্যয় ও প্রস্তাবনাগুলো এখন এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই আন্দোলন কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক চাপ, জনগণের সমর্থন এবং নেতৃত্বের বিচক্ষণতার ওপর।

একটি বছরের ব্যবধানে, এক দফা দাবি থেকে শুরু করে ২৪ দফা রাষ্ট্রপরিকাঠামোর রূপরেখা—এই রূপান্তর নিছক রাজনৈতিক বিবর্তন নয়, বরং একটি সমগ্র রাষ্ট্রচিন্তার আমূল পুনর্গঠনের আলামত। বাংলাদেশের রাজনীতির আগামী পথচলায় এনসিপি এবং তার ঘোষিত ইশতেহার ঠিক কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে, তা এখন সময়ের অপেক্ষা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত