আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক: ১০ লাখ টাকার বেশি আমানত ও ২০ লাখ টাকার ঋণে নতুন নির্দেশনা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৪ আগস্ট, ২০২৫
  • ৪০ বার
রিজার্ভে ধীরে ধীরে উন্নতি, আস্থায় ফিরছে অর্থনীতি

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক।একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ব্যাংকিং কার্যক্রম ও অর্থনৈতিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যার ফলে এখন থেকে ১০ লাখ টাকার বেশি ব্যাংক আমানত কিংবা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে চাইলেই বাধ্যতামূলকভাবে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে। শুধু তাই নয়, ২০ লাখ টাকার ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, জমি কিংবা ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন, এমনকি শিশুর স্কুলে ভর্তি—এমন নানা সেবা ও সুযোগ-সুবিধাও এখন আয়কর রিটার্ন জমার ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি এক নির্দেশনামূলক সার্কুলারে এসব তথ্য জানায়, যা সরকারের নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কার্যকর করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য একদিকে যেমন রাজস্ব ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ, তেমনি করদাতাদের পরিধি বাড়ানো এবং দেশের অর্থনৈতিক লেনদেনে অধিকতর জবাবদিহিতা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা।

গেজেটে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি ব্যাংকে ১০ লাখ টাকার বেশি টার্ম ডিপোজিট (মেয়াদি আমানত) বা সঞ্চয়পত্র কিনতে চান, তাহলে তাঁকে অবশ্যই আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে এবং সে রিটার্নের স্বীকৃত কপি ব্যাংকে জমা দিতে হবে। একইভাবে, ২০ লাখ টাকার ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রেও কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো এই নীতিমালার আওতায় ঋণ প্রদানে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র না পেলে ঋণ আবেদন গ্রহণ করবে না।

এছাড়া মোট ২৪টি ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবার ক্ষেত্রে কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—কোনো কোম্পানির পরিচালক বা স্পনসর শেয়ারহোল্ডার হওয়া, আমদানি-রপ্তানি লাইসেন্স নবায়ন, ট্রেড লাইসেন্স বা পেশাজীবী লাইসেন্স নবায়ন, জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ গ্রহণ, ড্রাগ লাইসেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্র, অগ্নিনির্বাপণ ছাড়পত্র, নৌযান ও ট্রলারের জরিপ সার্টিফিকেট, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুর ভর্তি ও আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স গ্রহণও এই বাধ্যবাধকতার আওতায় পড়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের কর প্রশাসনের জন্য একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন, যা একদিকে কর ফাঁকি রোধে সহায়ক হবে, অন্যদিকে সরকারি উন্নয়ন বাজেটের জন্য অতিরিক্ত রাজস্ব নিশ্চিত করবে। অনেক দিন ধরেই দেশে আয়কর রিটার্ন দাখিলের হার মোট জনসংখ্যার তুলনায় আশানুরূপ ছিল না। অথচ এক শ্রেণির মানুষ বিপুল পরিমাণ সম্পদ ও ব্যয়সম্পন্ন জীবনযাপন করে চলেছে, যাদের অনেকে করব্যবস্থার বাইরে ছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই নীতিমালার মাধ্যমে ব্যক্তিগত আয়ের প্রামাণ্যতা, অবৈধ অর্থপ্রবাহ শনাক্তকরণ এবং আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা অনেকাংশে নিশ্চিত হবে। ব্যাংকিং সেবায় কর রিটার্নের বাধ্যবাধকতা একপ্রকার প্রাতিষ্ঠানিক যাচাইয়ের দ্বার খুলে দেবে। এতে শুধু আয় নয়, আয় কোথা থেকে আসছে এবং কীভাবে খরচ হচ্ছে, তা যাচাই করা সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক দ্বৈত কর পরিহার চুক্তির শর্তাবলি এবং অর্থনৈতিক স্বচ্ছতার বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে বলে গেজেটে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সরকারের লক্ষ্য দেশের করব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তোলা, যাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারে।

কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণ ও স্বয়ংক্রিয়করণের প্রক্রিয়ায় এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) ইতোমধ্যে ডিজিটাল রিটার্ন ফাইলিং ব্যবস্থা চালু করেছে, যার মাধ্যমে যেকোনো করদাতা ঘরে বসেই অনলাইনে রিটার্ন জমা দিতে পারেন। এই সহজীকরণ ও ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ফলে এখন আর করদাতা হতে গড়িমসি করার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন নীতি নির্ধারকেরা।

তবে এই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন কতটা কার্যকরভাবে সম্ভব হবে, তা নির্ভর করছে ব্যাংকগুলো ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর আন্তরিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও তথ্যভিত্তিক পরিকাঠামোর ওপর। এর পাশাপাশি দরকার করসচেতনতা বৃদ্ধি, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যে।

সরকারি এই পদক্ষেপের ফলে আয়কর রিটার্ন দাখিল এখন কেবল ধনীদের দায়িত্ব নয়, বরং নাগরিকত্বের একটি মৌলিক কর্তব্য হয়ে উঠছে। দেশের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা, করনীতির সুবিচার ও আর্থিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত