সাঁতারু সাজিদের মৃত্যু নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তাল ছাত্রপ্রতিবাদ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৫ আগস্ট, ২০২৫
  • ৭৭ বার

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া উত্তেজনা আর শোক এখন স্পষ্টতই ক্ষোভে রূপ নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গঠিত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন এবং ফরেনসিক বিভাগ থেকে পাওয়া ময়নাতদন্ত রিপোর্টে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—সাজিদ পানিতে ডুবে মারা যাননি, বরং তাকে পরিকল্পিতভাবে শ্বাসরোধে হত্যার পর তার দেহ ফেলে দেওয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সংলগ্ন পুকুরে।

২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের আল কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের এই শিক্ষার্থীর মরদেহ গত ১৭ জুলাই বিকেলে শাহ আজিজুর রহমান হলের পুকুরে ভেসে ওঠে। তার মৃত্যুর খবরে মুহূর্তেই বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। তবে শুরু থেকেই সাজিদের পরিবার এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের দাবি ছিল—এটি নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যা। তারা জানায়, সাজিদ একজন দক্ষ সাঁতারু ছিলেন এবং পানিতে ডুবে মৃত্যুর প্রশ্নই ওঠে না। প্রাথমিকভাবে প্রশাসন ও নিরাপত্তা বিভাগ বিষয়টি নিয়ে নিরুত্তর থাকলেও, ক্রমাগত শিক্ষার্থীদের চাপ এবং গণমাধ্যমের আগ্রহে বিষয়টি তদন্তে গঠন করা হয় পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি।

কমিটির অনুসন্ধানে উঠে আসে বেশ কিছু সন্দেহজনক তথ্য। সাজিদ নিখোঁজ হওয়ার দিন অর্থাৎ ১৬ জুলাই সন্ধ্যায় তাকে শেষবার দেখা যায় ক্যাম্পাসেই। ওই রাতেও তার মোবাইল ফোন সক্রিয় ছিল। কললিস্ট বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাতের একটি কল রিসিভ হয়েছিল শেখপাড়া বসন্তপুর এলাকায়, পরবর্তী কল ট্র্যাক হয় বিজ্ঞান ভবনের আশপাশে। এই দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন তদন্তকারীদের কাছে প্রশ্নের উদ্রেক করে। তদুপরি, তার মোবাইল ফোন ও কিছু ব্যক্তিগত জিনিস এখনো উদ্ধার হয়নি, যা ঘটনার আড়ালে আরও কিছু বিষয় লুকিয়ে আছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

ময়নাতদন্ত রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, মৃতদেহে শ্বাসরোধের চিহ্ন রয়েছে এবং মৃত্যুর আগে আহত করার আলামতও পাওয়া গেছে। এই রিপোর্ট প্রকাশের পর পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে ‘নিরাপদ ক্যাম্পাস চাই’ শ্লোগানে শুরু হওয়া প্রতিবাদ এখন রূপ নিয়েছে ‘সাজিদের খুনিদের বিচারের দাবিতে’ এক অনড় আন্দোলনে।

শিক্ষার্থীরা টানা মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, ক্যাম্পাসে অবস্থান কর্মসূচি, সংবাদ সম্মেলনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব ছাত্র সংগঠন ও বিভাগীয় শিক্ষকগণ। তারা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন এবং দাবি তুলেছেন—এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হোক পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) অথবা পুলিশের ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর কাছে।

শুধু ক্যাম্পাস নয়, দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘সাজিদের হত্যার বিচার চাই’ স্লোগানে প্রতিবাদ মিছিল ও ছাত্র সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাজিদের ছবি ও হত্যার নেপথ্য কারণ অনুসন্ধানের আহ্বান জানিয়ে চলছে সমন্বিত প্রচারণা।

শিক্ষার্থীদের দাবি—সাজিদের খুনিরা যেন কোনোভাবেই রক্ষা না পায় এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেন বিষয়টিকে ধামাচাপা না দেয়। তারা চাইছেন, সাজিদের পরিবারের জন্য প্রশাসনিক ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা হোক এবং এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা শিক্ষার্থীদের আবেগ ও ক্ষোভকে সম্মান জানায় এবং তাদের সুপারিশ অনুযায়ী উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, “ঘটনাটি আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক এবং বিব্রতকর। তদন্তে কোনো গাফিলতি বা পক্ষপাত করা হবে না।”

সাজিদের মৃত্যু এখন আর শুধুমাত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয় নয়—তা হয়ে উঠেছে সারাদেশের ছাত্রসমাজের প্রশ্নবিদ্ধ নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার প্রতীক। এই হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ সত্য উন্মোচিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে—এই ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এবং তারা জানিয়ে দিয়েছেন, প্রয়োজনে আন্দোলন জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

জবাব চায় ক্যাম্পাস, ন্যায়বিচার চায় ছাত্রসমাজ। সাজিদের আত্মা যেন ন্যায়বিচার পায়—এই আশায় এখন গোটা দেশের ছাত্রসমাজ একসাথে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত