প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দীর্ঘ নয় মাস ধরে অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় প্রতিনিয়তই নতুন মাত্রা নিচ্ছে। এবার জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ এক হৃদয়বিদারক তথ্য প্রকাশ করে জানালো, গাজায় চলমান অবরোধ, যুদ্ধ এবং মানবিক সহায়তার অভাবে প্রতিদিন গড়ে ২৮ জন শিশু মারা যাচ্ছে। এই সংখ্যাটি যেন প্রতিটি দিন একটি শ্রেণিকক্ষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার সমতুল্য—একটি জাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংসের পরিপূর্ণ চিত্র।
সোমবার ইউনিসেফ সামাজিক মাধ্যম ‘এক্স’-এ (পূর্বের টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে জানায়, গাজায় শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে শুধুমাত্র বোমা হামলায় নয়; বরং অপুষ্টি, তীব্র অনাহার, নিরাপদ পানি ও ওষুধের অভাবেও শিশুমৃত্যু ব্যাপক হারে ঘটছে। সংস্থাটি বলছে, সেখানে শিশুরা প্রতিদিনই নির্দয়ভাবে মারা যাচ্ছে, আর আন্তর্জাতিক সহায়তা কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠেছে ইসরাইলি নিষেধাজ্ঞার কারণে।
ইউনিসেফ তাদের বিবৃতিতে বলেছে, এই মানবিক সংকট থেকে শিশুদের রক্ষা করতে হলে যুদ্ধবিরতি ছাড়া আর কোনো পথ নেই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মানবাধিকার সংস্থা এবং প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে যেন অবিলম্বে খাদ্য, চিকিৎসা, নিরাপদ পানি এবং জীবন রক্ষাকারী সহায়তা গাজায় প্রবেশ করতে পারে। সহায়তা নয়, এখন দরকার একটি মৌলিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত—বিরতিহীন আগ্রাসনের অবসান।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরাইল গাজায় যেভাবে হামলা ও দখল অভিযানে লিপ্ত হয়েছে, তা ইতোমধ্যেই ইতিহাসের এক ভয়াবহতম মানবিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে গাজায় নিহতের সংখ্যা ছুঁয়েছে ৬১ হাজার, যার অর্ধেকের বেশি নারী ও শিশু। শহর, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আশ্রয়কেন্দ্র—কোন কিছুই রক্ষা পায়নি ইসরাইলি বোমাবর্ষণ থেকে। অবকাঠামো ধ্বংসের পাশাপাশি সঙ্কুচিত হয়েছে খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ, যা গাজাকে ঠেলে দিচ্ছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে ইসরাইলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। টাইমস অব ইসরাইলসহ দেশটির বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজা উপত্যকার বাকি অংশও সম্পূর্ণভাবে দখলের নির্দেশ দিতে প্রস্তুত। এখন পর্যন্ত প্রায় ৭৫ শতাংশ ভূখণ্ডই ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ-এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বাকি অঞ্চলগুলোতেও পূর্ণ দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে, যা যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও দীর্ঘায়িত ও ভয়াবহ করে তুলবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ইসরাইলের অভ্যন্তরেই রয়েছে তীব্র বিতর্ক ও আপত্তি। দেশটির সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও কূটনীতিকদের একটি অংশ এমন বিস্তৃত দখল অভিযানের যৌক্তিকতা ও কৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কারণ, গাজায় সামরিক দখল যত বাড়ছে, আন্তর্জাতিক চাপ, বৈদেশিক সম্পর্ক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট ততই গভীর হচ্ছে।
এরই মধ্যে ইসরাইলের সাবেক ছয় শতাধিক নিরাপত্তা কর্মকর্তা এক বিরল পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। তারা ট্রাম্পকে আহ্বান জানিয়েছেন, যেন তিনি গাজায় যুদ্ধ বন্ধে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন। এটি স্পষ্ট যে, দেশটির অভ্যন্তরেও গাজা যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, বিশেষ করে মানবিক বিপর্যয় ও যুদ্ধপরবর্তী আন্তর্জাতিক বিচারের আশঙ্কা ঘিরে।
এই চিঠি এবং ইউনিসেফের তথ্য—উভয়ই মিলিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে, বিশ্বের সবচেয়ে প্রচারিত মানবাধিকার স্লোগান ‘Never Again’ কি শুধুই একটি ফাঁকা বুলি হয়ে গেছে? যখন শিশুদের মৃত্যুকে আর ‘দুর্ভাগ্য’ বলা যায় না, বরং তা হয়ে ওঠে প্রতিদিনের এক নির্ধারিত সংখ্যায় রূপান্তরিত, তখন তা আর কেবল যুদ্ধ নয়—তা হয় যুদ্ধাপরাধ।
গাজা এখন আর কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, এটি বিশ্ব বিবেকের এক কঠিন পরীক্ষা। এই মুহূর্তে যদি শক্তিধর রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নিরবতা ভাঙতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ইতিহাস একদিন তাকেও অপরাধীর আসনে দাঁড় করাবে। কারণ প্রতিদিন ২৮টি শিশু মারা যাওয়ার ঘটনা শুধু একটি সংবাদ নয়—এটি প্রতিটি নীরবতার বিরুদ্ধে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত কণ্ঠস্বর।