প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বিএনপির ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান দিবসের বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে দলটির মধ্যে প্রচণ্ড বিভাজন ও কোন্দলের দৃশ্যপট আবারও প্রকাশ্যে উঠে এসেছে। ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলায় মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিএনপির দুটি গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ১৫ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। একদিকে দিনটি স্মরণে আয়োজন ছিল বিজয় মিছিলের, অন্যদিকে সেই দিনই হয়ে উঠল রক্তাক্ত বিবাদের এক উদাহরণ।
প্রত্যক্ষদর্শী ও বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্যমতে, দাগনভূঞা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আকবর হোসেনের নেতৃত্বে দলীয় একটি মিছিল শহরের প্রধান সড়ক ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল। একই সময় শহরের জিরো পয়েন্টে একটি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজন করেছিল বিএনপিরই আরেকটি পক্ষ, যার নেতৃত্বে ছিলেন পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী সাইফুর রহমান স্বপন ও জেলা ছাত্রদলের সাবেক নেতা কাজী জামশেদুর রহমান ফটিক। ঠিক তখনই দুই পক্ষের মধ্যে স্লোগান ঘিরে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপক্ষ অপর পক্ষের বিরুদ্ধে “ভুয়া ভুয়া” স্লোগান দিলে মুহূর্তেই শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা।
এ সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে কাজী জামশেদুর রহমান ফটিক, সাইমুন হক রাজীব, ইঞ্জিনিয়ার সহেল, সরোয়ার, বেলাল, সিফাত, মিলন, সঞ্জিত দাস, জাহাংগীর, তোহীদ ও মানিকসহ অন্তত ১৫ জনের নাম জানা গেছে। স্থানীয় চিকিৎসা কেন্দ্রে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ঘটনাটি রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতার ইঙ্গিতও বহন করে। একটি দলীয় অনুষ্ঠানে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ দলটির শৃঙ্খলা ও ঐক্যের প্রশ্নে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আকবর হোসেনের নেতৃত্বাধীন গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে দলীয় নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক প্রাধান্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে, যেখানে তার বিরোধীপক্ষ অভিযোগ করছে স্বৈরাচারী ও সুবিধাবাদী নেতৃত্বের।
সংঘর্ষের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে আকবর হোসেন বলেন, “আমরা শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করছিলাম। কিন্তু বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতা ফটিক এবং আওয়ামী লীগ থেকে আগত আবুল হাসেম বাহাদুর নেতৃত্বে আমাদের মিছিলে অতর্কিত হামলা চালানো হয়। এতে আমাদের অন্তত আটজন আহত হয়েছেন।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, “তারা ইচ্ছাকৃতভাবে দিনটিকে নষ্ট করার ষড়যন্ত্র করেছে।”
অন্যদিকে, বিপরীত পক্ষের নেতা কাজী সাইফুর রহমান স্বপনের ভাষ্য ভিন্ন। তিনি বলেন, “আমরা জিরো পয়েন্টে একটি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প করছিলাম জনগণের উপকারে। আকবর গ্রুপ মিছিল নিয়ে আমাদের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় অপমানজনকভাবে ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে স্লোগান দেয়। তাদের উসকানিতেই সংঘর্ষ শুরু হয়, যেখানে আমাদের সাতজন কর্মী আহত হয়েছেন।”
এই দুই ভিন্ন বক্তব্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে, সংঘর্ষটি ছিল পূর্ব পরিকল্পিত নয়, তবে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা দলীয় কোন্দল ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্বেরই বিস্ফোরণ। একদিকে বয়ঃজ্যেষ্ঠ ও সাংগঠনিকভাবে প্রবল প্রভাবশালী আকবর হোসেনের নেতৃত্বে দলটির পুরনো অংশ, অন্যদিকে উঠতি প্রজন্ম ও স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় তরুণ নেতাদের একটি অংশ। উভয় পক্ষই নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বৈধতা প্রতিষ্ঠায় মরিয়া, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতায়।
দাগনভূঞা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওয়াহিদ পারভেজ জানিয়েছেন, “সংঘর্ষের পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে অবস্থা শান্ত রয়েছে এবং পুলিশ সতর্ক অবস্থানে আছে। ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করা হচ্ছে, প্রয়োজনে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় ঐতিহ্য, আন্দোলনের ইতিহাস ও সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে গর্ব করলেও বিএনপির অভ্যন্তরে এই ধরনের সংঘর্ষ দলটির রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে জাতীয় রাজনীতিতে সরকারবিরোধী অবস্থান আরও শক্তিশালী করার এই সময়ে নিজেদের মধ্যে বিভাজন তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতাকে প্রকট করে তুলছে।
জনগণের দৃষ্টিতে এই সংঘর্ষ আবারও প্রমাণ করল যে, রাজনীতি কেবল মিছিল আর স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এটি মূল্যবোধ, ঐক্য এবং নেতৃত্বের সততার ওপর নির্ভরশীল। যে দল নিজেদের ঘরেই শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে পারে না, তাদের পক্ষে বৃহৎ জাতীয় প্রশ্নে নেতৃত্ব দেওয়া কতটা বাস্তবসম্মত—এই প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মনেও ঘুরপাক খাচ্ছে।