প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক ।একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মোড়ফেরাতে পরিণত হওয়া ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পার হলেও এখনো নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে স্পষ্ট কোনো চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুতই রূপ নেয় সরকারের পদত্যাগের একদফা দাবিতে। টানা সহিংসতা, সংঘর্ষ এবং দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের প্রায় দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটে। তবে এই পরিবর্তনের পেছনে যে বিশাল রক্তক্ষয়ের ইতিহাস রয়েছে, তা আজও একটি নির্ভুল ও সর্বজনগ্রাহ্যভাবে প্রণীত তালিকার অভাবে ঘোলাটে হয়ে আছে।
সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হলেও সেই তালিকায় অনিয়ম ও বিভ্রান্তি থাকার অভিযোগ ক্রমাগত সামনে আসছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত নিহত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ৮৪৪ জনকে, যাদের ‘শহীদ’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ—প্রায় ১,৪০০ জনের মতো। এই ব্যাপক পার্থক্য স্পষ্টভাবে একটি প্রশ্নের জন্ম দেয়: এই প্রাণগুলো কোন হিসাবে হারিয়ে গেল?
সরকারি গেজেট নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠেছে। প্রথম ধাপে ২১ ডিসেম্বর ২০২৪ সালে প্রকাশিত খসড়া তালিকায় নিহত দেখানো হয় ৮৫৮ জন এবং আহত ১১ হাজার ৫৫১ জন। সেই তালিকা পরে ১৬ জানুয়ারি ২০২৫-এ চূড়ান্ত আকারে প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, যেখানে ৮৩৪ জন নিহতকে শহীদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এরপর ৩০ জুন দ্বিতীয় দফার হালনাগাদ তালিকায় নিহতের সংখ্যা বাড়িয়ে ৮৪৪ জন করা হয়। কিন্তু এতে দেখা যায়, নিহতদের মধ্যে কয়েকজনের নাম একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আবার এমন ব্যক্তিও তালিকাভুক্ত হয়েছেন যারা অন্য ঘটনার শিকার হয়েছিলেন। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে সন্দেহ ও ক্ষোভ উভয়ই দানা বাঁধতে শুরু করেছে।
মন্ত্রণালয়ের সচিব ইশরাত চৌধুরী সংবাদমাধ্যমকে জানান, ‘তালিকাটি এখনও চূড়ান্ত নয়। ইতোমধ্যে আমরা কয়েকটি ভুল চিহ্নিত করেছি। ৮৪৪ জন থেকে সংখ্যা কমতে পারে, কারণ ১৫-১৬ জনের নাম বাদ পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
অন্যদিকে জাতিসংঘের প্রতিবেদনের তথ্য অনেক বেশি ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরে। মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) গত ১২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক তদন্ত প্রতিবেদনে জানায়, জুলাই-আগস্ট মাসজুড়ে রাইফেল ও শটগানের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ১,৪০০ জন। আহত হয়েছে হাজার হাজার। আটক করা হয়েছিল অন্তত ১১ হাজার ৭০০ জনকে, যাদের মধ্যে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ ছিল শিশু। প্রতিবেদনটি ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র আলোড়ন তোলে। কিন্তু সরকার এখন পর্যন্ত জাতিসংঘের প্রতিবেদনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকারও করেনি, আবার পূর্ণাঙ্গভাবে মেনেও নেয়নি।
সরকার দাবি করছে, নিহতদের মধ্যে কেবল আন্দোলনকারী নয়, পুলিশ সদস্য ও সরকারি দলীয় কর্মীরাও ছিলেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি গেজেটে কেবল বিরোধীদের হাতে নিহত ব্যক্তিদের তালিকাই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যাখ্যা পর্যাপ্ত নয়। বরং তালিকা প্রস্তুতে গাফিলতি, পক্ষপাতমূলক চয়ন, বেওয়ারিশ লাশের তথ্য উপেক্ষা এবং রাজনৈতিক চাপের কারণে প্রকৃত চিত্রটি আড়ালেই রয়ে গেছে।
গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এত বড় ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখনো আমরা একটি নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য তালিকা তৈরি করতে পারিনি—এটা নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্যজনক। এতে করে আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস বিকৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।’
এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসছে: রাষ্ট্র কি নিজ নাগরিকদের মৃত্যুর সঠিক হিসাব রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে তা গোপন রাখা হচ্ছে? নিহতদের পরিবার ও স্বজনেরা আজও তাদের প্রিয়জনের মৃত্যুর স্বীকৃতি ও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। এমন বাস্তবতায়, একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও যাচাইযোগ্য তদন্ত এবং পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন জরুরি হয়ে উঠেছে, যা ইতিহাসের দায় মেটাতে পারে—কেবল রাজনৈতিক দায় নয়, মানবিক দিক থেকেও।
গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পর, শহরের দেয়ালে এখনও রক্তের দাগ শুকায়নি, শোকার্ত পরিবারগুলোর চোখে এখনও অশ্রু। অথচ তাদের সন্তান, ভাই, বা স্বামীর মৃত্যুর কোনো স্বীকৃতি, বিচার বা প্রামাণ্য তালিকাতেও ঠাঁই হয়নি। এমন এক বাস্তবতায় নিহতের সংখ্যা শুধুই পরিসংখ্যান নয়, বরং একটি জাতির বিবেকের দায়। সেই দায় কতটা সরকার, প্রশাসন বা রাষ্ট্র নিতে প্রস্তুত—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।