কিডনি ক্যান্সারে বাড়ছে মৃত্যুহার, উচ্চ ঝুঁকিতে পুরুষরাই

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৬ আগস্ট, ২০২৫
  • ৭৯ বার

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক।একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়েই কিডনি ক্যান্সারে আক্রান্ত এবং মৃত্যুবরণকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, সময়মতো শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান ও গবেষণা প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এই প্রাণঘাতী রোগে পুরুষরা নারীদের তুলনায় দ্বিগুণ হারে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মৃত্যুর ঝুঁকিও বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), গ্লোবাল ক্যান্সার অবজারভেটরি (GLOBOCAN) এবং ক্যান্সার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (CRI) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে কিডনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন প্রায় ২ লাখ মানুষ। এই রোগে আক্রান্তদের মধ্যে ৬৫ শতাংশের বেশি পুরুষ, যাদের মৃত্যুহার নারীদের তুলনায় অন্তত ৭০ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটও ব্যতিক্রম নয়। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (NICRH) পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২ হাজারের বেশি মানুষ কিডনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন, যার বড় অংশই পুরুষ। অথচ সাধারণ জনসচেতনতার অভাবে এবং কিডনি সম্পর্কিত সমস্যাকে উপেক্ষা করার প্রবণতা এই রোগটিকে নিরব ঘাতকে পরিণত করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনি ক্যান্সারের প্রধান ঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে ধূমপান, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, পারিবারিক ইতিহাস, দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ এবং রাসায়নিক পদার্থের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ। এগুলোর মধ্যে ধূমপান সবচেয়ে বড় ঝুঁকি, যা পুরুষদের মধ্যে অনেক বেশি পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া তামাকজাত দ্রব্য সেবন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও কর্মস্থলে বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে থাকাও ক্যান্সার বৃদ্ধির জন্য দায়ী হতে পারে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুজিবুর রহমান বলেন, “কিডনির টিউমার প্রাথমিক অবস্থায় খুব একটা লক্ষণ প্রকাশ করে না। ফলে রোগীরা অনেক সময় দেরিতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রক্তমিশ্রিত প্রস্রাব, কোমরে ব্যথা ও ওজন হ্রাসের মতো উপসর্গ দেখা দেয় যখন ক্যান্সারটি আগ্রাসী পর্যায়ে পৌঁছে যায়।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের দেশে কিডনি ক্যান্সার শনাক্তে উন্নত প্রযুক্তির অভাব এবং সচেতনতার ঘাটতির কারণে রোগীর মৃত্যু ঝুঁকি অনেক বেশি। পুরুষদের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্যের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করার প্রবণতা তাদের ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে।”চিকিৎসা বিজ্ঞানে কিডনি ক্যান্সার চিকিৎসার নানা অগ্রগতি ঘটলেও বাংলাদেশে তা এখনো সীমিত পরিসরে আছে। উন্নত দেশে বর্তমানে সার্জারি, টার্গেটেড থেরাপি এবং ইমিউনোথেরাপির মাধ্যমে কিডনি ক্যান্সার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে। তবে এসব চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, কিডনি ক্যান্সার প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে জনসচেতনতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে স্ক্রিনিং ব্যবস্থা চালু করা। বিশেষত ধূমপায়ী, স্থূল ব্যক্তি, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপে ভোগা বা দীর্ঘমেয়াদী কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।

কিডনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার বাড়ার এই বাস্তবতায় জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ, হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া সচেতনতা তৈরি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলো কার্যকর করা সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারিভাবে জাতীয় পর্যায়ের তথ্যভিত্তিক সচেতনতা ক্যাম্পেইন এবং কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা কর্মসূচি চালু করা গেলে এই নীরব ঘাতক রোগটি নিয়ন্ত্রণের পথ উন্মোচিত হবে।

অন্যদিকে, রোগ প্রতিরোধে সবার আগে প্রয়োজন ব্যক্তি পর্যায়ের জীবনযাপন সংশোধন, ধূমপান বর্জন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং কিডনি সংক্রান্ত উপসর্গ অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ। সামাজিক প্রচারণা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এই রোগে মৃত্যুহার কমিয়ে আনা এখনও সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত