প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনপ্রক্রিয়া আরও সুষ্ঠু, সহিংসতামুক্ত ও নিরপেক্ষ রাখতে সারা দেশের ১৯৪১ জন সম্ভাব্য প্রার্থীর বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। কেন্দ্রীয়ভাবে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) এই তথ্য সংগ্রহের কাজ পরিচালনা করে। এতে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, আর্থিক অবস্থান, সামাজিক প্রভাব এবং আইনগত জটিলতাসহ মোট ১১টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের ৪ জুলাই থেকে মাঠপর্যায়ে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সম্ভাব্য প্রার্থীদের বাসা, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক অফিস ঘুরে সরাসরি সাক্ষাৎকার নেওয়ার পাশাপাশি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সামাজিক প্রতিনিধি এবং গোপন সোর্সের মাধ্যমে তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়। কেউ কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজের তথ্য সরবরাহ করলেও, আবার অনেক প্রার্থী তথ্য গোপনের চেষ্টা করেছেন বলেও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
এই তথ্যসংগ্রহের উদ্দেশ্য শুধু নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়, বরং যাতে কোনো অপরাধপ্রবণ বা বিতর্কিত ব্যক্তি নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি হয়ে না উঠতে পারে, সে বিষয়েও সচেতন থাকার প্রয়াস চালাচ্ছে পুলিশ।
এ সংক্রান্ত পুলিশের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায় সবচেয়ে বেশি প্রার্থী রয়েছেন ঢাকা বিভাগে—৭০টি আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীর সংখ্যা ৫৮০ জন। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে ৫৮টি আসনে ৩৪৮ জন, খুলনা বিভাগে ৩৬টি আসনে ২১৬ জন, রংপুরে ৩৩টি আসনে ১৯৮ জন, রাজশাহীতে ৩০ আসনে ১৮০ জন, সিলেটে ১৯ আসনে ১৫২ জন, বরিশালে ২১ আসনে ১৪৭ জন এবং ময়মনসিংহে ২৪ আসনে ১২০ জন সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
এই তালিকা অনুযায়ী, প্রতি আসনে গড়ে ছয় থেকে আটজনের মতো প্রার্থী এবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন বলে অনুমান করা হচ্ছে। পুলিশি তথ্য অনুসারে, প্রার্থীদের মধ্যে ৭০ জনের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির প্রাথমিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকাতেই ২৫ জনের বিরুদ্ধে এ ধরনের তথ্য উঠে এসেছে।
পুলিশের প্রতিবেদন প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রার্থীর পেশাগত পরিচয়, রাজনৈতিক ইতিহাস, সহিংসতায় জড়িত থাকার সম্ভাবনা, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রভাব, বিচারাধীন মামলা বা আগের সাজা, ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরন, আর্থিক লেনদেন, বিদেশে যাতায়াত, মোবাইল নম্বর, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সম্পদের বিবরণসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে করে একটি বিস্তৃত এবং সুনির্দিষ্ট প্রোফাইল তৈরি করা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মনে করছে, নির্বাচনের সময় বা তার আগে ও পরে কোনো পক্ষ নির্বাচন বানচাল করার অপচেষ্টা চালাতে পারে। বিশেষ করে একটি ফ্যাসিবাদী শক্তি মাঠে সক্রিয় হয়ে সহিংসতা উসকে দিতে পারে—এমন গোয়েন্দা আশঙ্কার ভিত্তিতেই বাড়ানো হয়েছে নজরদারি এবং তথ্য সংগ্রহের এই উদ্যোগ। নির্বাচনী এলাকাগুলোতে টহল জোরদার করা হচ্ছে এবং কোথাও কোথাও অতিরিক্ত বাহিনীও মোতায়েন করা হবে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, “সম্ভাব্য প্রার্থীদের সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা শুধু নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং এটি ভবিষ্যতে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা রোধ ও অপরাধপ্রবণদের চিহ্নিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমরা চাই, একটি অবাধ, নিরপেক্ষ এবং সহিংসতামুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক।”
এদিকে রাজশাহী বিভাগের এক পুলিশ সুপার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রার্থীদের তালিকা করে ইতিমধ্যেই তা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এই তালিকাগুলো নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর সঙ্গে শেয়ার করা হবে।
নির্বাচনী প্রস্তুতির এমন গোপন পর্যবেক্ষণ ও তথ্যসংগ্রহ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখলেও, অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিষয়টিকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের শঙ্কা বলেও অভিহিত করছেন। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা সম্পূর্ণ পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাই রিপোর্টে প্রতিফলিত হবে।
এই তথ্যভিত্তিক প্রস্তুতির পর, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার হবে এবং একইসঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাহীনভাবে সম্পন্ন করার পথও সুগম হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ।