ট্রেন নয় যেন ভ্রাম্যমাণ দুর্গন্ধের ভাণ্ডার: পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় ছয় আন্তঃনগরে চরম যাত্রী দুর্ভোগ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৭ আগস্ট, ২০২৫
  • ৬৫ বার

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৫। নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ঢাকা থেকে খুলনা কিংবা চিলাহাটী থেকে রাজশাহী—ট্রেনের দীর্ঘপথ যেন এখন যাত্রীদের জন্য হয়ে উঠেছে এক প্রকার অনির্বচনীয় শাস্তির নাম। পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ছয়টি আন্তঃনগর ট্রেনে যাত্রীসেবা যে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে, তার বাস্তবচিত্র উঠে আসছে প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রীর অভিযোগে। গত এক মাস ধরে এসব ট্রেনে কার্যত কোনো ধরণের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না। ফলে ট্রেনযাত্রা পরিণত হয়েছে অস্বাস্থ্যকর, দুর্গন্ধময় ও ক্লান্তিকর এক অভিজ্ঞতায়।

জানা গেছে, গত ১ জুলাই থেকে চিত্রা এক্সপ্রেস, সুন্দরবন এক্সপ্রেস, জাহানাবাদ এক্সপ্রেস, রূপসা এক্সপ্রেস, সীমান্ত এক্সপ্রেস ও কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস ট্রেনগুলোতে আর কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাজ করছেন না। কারণ, চুক্তিভিত্তিক পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নিয়োগ দেওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রেল কর্তৃপক্ষের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। নতুন কোনো চুক্তি না হওয়ায় কিংবা পুরোনো ঠিকাদারকে কার্যাদেশ না দেওয়ায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেছে।

ফলে টয়লেট থেকে শুরু করে বেসিন, হাত ধোয়ার জায়গা, মশা তাড়ানোর স্প্রে, দুর্গন্ধ দূর করার জন্য এয়ার ফ্রেশনার—সব কিছুই অনুপস্থিত। দীর্ঘ ট্রেনভ্রমণের মধ্যেই যাত্রীদের নোংরা টয়লেট ব্যবহার করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও পানি উপচে মেঝে জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক যাত্রী শৌচাগারে না গিয়ে পুরো সময় না খেয়ে, পানি না পান করে যাত্রা শেষ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

চিত্রা এক্সপ্রেসের যাত্রী ইলিয়াস আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও যখন নোংরা পরিবেশে বসে থাকতে হয়, তখন এই ভ্রমণ যেন যন্ত্রণার হয়ে দাঁড়ায়।” একই ট্রেনের আরেক যাত্রী মাহমুদা খানম বলেন, “টয়লেট ব্যবহার না করতে পেরে অনেক যাত্রী চরম বিপাকে পড়ছেন। কারও কারও সঙ্গে ট্রেন কর্মীদের তর্কাতর্কি পর্যন্ত হচ্ছে।”

চিত্রা এক্সপ্রেসের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র টিটিই আবদুল আলীম বিশ্বাস মিঠুও এই দুরবস্থার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় যাত্রীদের অসন্তোষ চরমে। প্রতিদিনই তাদের কাছ থেকে বিরূপ মন্তব্য শুনতে হচ্ছে।

দুই দিক থেকেই এখন এই সংকট: একদিকে যাত্রীরা সেবা পাচ্ছেন না, অন্যদিকে বেকার হয়ে পড়েছেন রেল সংযুক্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। পেশাগতভাবে ঝরে পড়া কর্মীদের একজন, মধু হাসান বলেন, “এক মাস ধরে ঘরে বসে আছি। সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।” তার মতো ওয়াকিল আহমেদ ও কালীদাস নামের আরও কয়েকজন কর্মীও অনিশ্চয়তা ও হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পদ্মা ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী রফিকুল ইসলাম সুলতান জানান, “আমাদের আগের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু রেল নতুন টেন্ডার প্রক্রিয়া বাতিল করায় আমাদের লোকজনকে কাজে লাগানোর সুযোগ নেই।”

অন্যদিকে রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (ক্যারেজ অ্যান্ড ওয়াগন) রবিউল ইসলাম বলেন, “নতুন টেন্ডার জমা দেওয়ার পর চূড়ান্ত অনুমোদনের আগমুহূর্তে সেটি বাতিল করা হয়েছে। এখন নতুনভাবে আবার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে, যা শেষ হতে আরও দুই মাস লাগতে পারে।”

এই অবস্থায় যাত্রীরা প্রশ্ন তুলেছেন—রেলভাড়া তো একটুও কমেনি, তাহলে কেন সেবার মান এতোটা নেমে গেলো? কীভাবে প্রশাসনের উদাসীনতায় জনসাধারণ এই দুর্ভোগে পতিত হচ্ছে?

এমন পরিস্থিতিতে রেলের ভেতরে বিদ্যমান অব্যবস্থাপনা এবং কর্তৃপক্ষের অনাগ্রহ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে এক গভীর সংকটকে। দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন খাতে এমন বিশৃঙ্খলা আর যাত্রীসেবার চূড়ান্ত ব্যর্থতা রেলওয়ের প্রতি জনগণের আস্থা প্রতিনিয়ত হ্রাস করছে। যাত্রীসেবাকে উপেক্ষা করে অব্যবস্থাপনা আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ডুবে থাকা রেল প্রশাসনের কাছে এখনই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে সাধারণ মানুষ: ট্রেনে কি মানুষের চেয়ে নোংরার মূল্য এখন বেশি?

এই প্রশ্নের উত্তর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত দিতে পারবে, তার ওপরই নির্ভর করবে যাত্রীসেবার ভবিষ্যৎ। রেলের প্রতি যাত্রীদের সর্বোচ্চ দাবি—পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করে জরুরি ভিত্তিতে যাতায়াতকে স্বস্তিদায়ক ও মানবিক করে তোলা হোক। এই দাবি এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং ন্যূনতম অধিকার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত