প্রকাশ: ০৯ অগাস্ট ‘২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবাসিক হলে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে নতুন করে উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ছাত্র ফেডারেশনের সাবেক সদস্যসচিব ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও মুখপাত্র উমামা ফাতেমার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি কবি সুফিয়া কামাল হলে বাম ছাত্র সংগঠন ছাড়া অন্য সব রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন। শুক্রবার (৮ আগস্ট) হলের প্রাধ্যক্ষ বরাবর দেওয়া এক দরখাস্তে তিনি এই দাবি উত্থাপন করেন, যা নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় শুক্রবার সকালে, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলে একযোগে আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল (ছাত্রদল)। এর মধ্যে কবি সুফিয়া কামাল হলে সাত সদস্যের কমিটি গঠনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই বিতর্ক দেখা দেয়। অনেক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গত বছরের ১৭ জুলাই হলে সব ধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এরপর থেকে এ বিষয়ে কোনো নতুন নীতি বা কাঠামো নির্ধারণ করেনি। ফলে এই প্রথম একসঙ্গে একাধিক হলে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সংগঠন কমিটি ঘোষণা করায় বিষয়টি অনেকের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে।
দরখাস্তে উমামা ফাতেমা উল্লেখ করেন, গত বছরের জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে প্রশাসনের কাছ থেকে সুফিয়া কামাল হলে সব ধরনের ‘বাজনীতি’—যেমন ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, শিবির ও বাগছাস—নিষিদ্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি আদায় করা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, এই চুক্তি এক বছর ধরে বলবৎ ছিল, তবে সম্প্রতি কিছু সংগঠন গোপনে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে গেছে এবং সর্বশেষ ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা সেই চুক্তি ভঙ্গের শামিল। তার অভিযোগ, এটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা। তিনি সতর্ক করে দেন, শুক্রবার রাতের মধ্যে এই কমিটি বাতিল না হলে শিক্ষার্থীরা কঠোর আন্দোলনে নামবে।
তবে দরখাস্তে লক্ষ্য করা যায়, উমামা ফাতেমা চারটি সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবি তুললেও বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোকে নিয়ে কোনো বক্তব্য দেননি। অথচ হলে বামপন্থী শিক্ষার্থীরাও সক্রিয় এবং অনেক হলে তাদের নিজস্ব কমিটিও বিদ্যমান। এ বিষয়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠক হামজা মাহবুব লেখেন, “উমামা ফাতেমা হলে বাম রাজনীতি ছাড়া অন্য কোনো রাজনীতি চান না। এটা কেমন কথা? মানে হিপোক্রেসি এট ইট’স পিক! হল ও একাডেমিক এলাকায় রাজনীতির বিরুদ্ধে সবাই, আর উনি বাকি সব রাজনীতির বিরুদ্ধে, কিন্তু বাম রাজনীতি নিয়ে কোনো আপত্তি নেই।”
এদিকে শুক্রবার মধ্যরাতে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার নেয়। হলে হলে ছাত্ররাজনীতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে। উত্তেজনার একপর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীরা হলের গেট ভেঙে বের হয়ে আসেন এবং তীব্র বিক্ষোভ শুরু করেন। শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত বৈঠক করে। দিবাগত রাত ২টা ৪৫ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খানের উপস্থিতিতে প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমেদ ঘোষণা দেন যে, ঢাবির আবাসিক হলে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে।
এই ঘটনায় ঢাবি ক্যাম্পাসে রাজনীতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও হলের স্বশাসন নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী মনে করছেন, বাম রাজনীতি হোক বা অন্য কোনো দলীয় রাজনীতি, আবাসিক হলে রাজনৈতিক কার্যক্রম চললে শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে, কেউ কেউ বলছেন, একটি দলকে বাদ দিয়ে অন্যদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী। ফলে, এই ঘটনাকে ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি অঙ্গনে আগামী দিনগুলোতে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।