প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক।একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ফিলিস্তিনের গাজা সিটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ইসরায়েলের পরিকল্পনাকে ঘিরে জাতিসংঘে তীব্র সমালোচনা ও কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে তেল আবিব। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, গ্রিস ও স্লোভেনিয়াসহ একাধিক দেশ পরিকল্পনাটি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে সতর্ক করেছে যে এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করছে এবং ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তিতে কোনো সহায়তা না করে বরং তাঁদের জীবন আরও বিপদের মুখে ফেলবে।
গতকাল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন। চীন এই পরিকল্পনাকে গাজার জনগণের ওপর “সমষ্টিগত শাস্তি” হিসেবে আখ্যা দিয়ে তা অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করে, আর রাশিয়া বিচার-বিবেচনাহীনভাবে সংঘাত বাড়ানোর বিষয়ে সতর্ক করে। জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব মিরোস্লাভ ইয়েনচা বৈঠকে বলেন, এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে গাজায় নতুন মানবিক বিপর্যয় নেমে আসবে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রভাব ফেলবে এবং আরও বাস্তুচ্যুতি, হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞের পথ খুলে দেবে।
জাতিসংঘের মানবিক কার্যালয়ের কর্মকর্তা রমেশ রাজাসিংহাম জানান, গাজার খাদ্যসংকট এখন আর কেবল সম্ভাব্য হুমকি নয়, বরং সরাসরি অনাহারে পরিণত হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার থেকে এখন পর্যন্ত অনাহার ও অপুষ্টিতে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে, ফলে এ কারণে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১৭। মে মাসের শেষ দিকে বিতর্কিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) ত্রাণ বিতরণকেন্দ্র স্থাপনের পর থেকে ত্রাণ নিতে গিয়ে অন্তত ১,৩৭৩ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।
তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পরিকল্পনার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান ধরে রেখেছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, হামাসের হাত থেকে গাজাকে মুক্ত করার জন্য এবং যুদ্ধের ইতি টানতে এ পরিকল্পনাই “সবচেয়ে কার্যকর উপায়”। নেতানিয়াহু অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, গাজাবাসীদের অনাহারে রাখার কোনো উদ্দেশ্য ইসরায়েলের নেই, বরং গাজায় থাকা ইসরায়েলি জিম্মিদেরই ইচ্ছাকৃতভাবে অনাহারে রাখা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীকে গাজা সিটির অবশিষ্ট দুটি হামাস ঘাঁটি এবং আল-মাওয়াসি এলাকায় অবস্থিত ঘাঁটি ধ্বংস করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তিনি গাজায় মানবিক সহায়তা বাড়ানোর জন্য তিন দফা পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন, যার মধ্যে রয়েছে নিরাপদ করিডর স্থাপন, আকাশপথে সাহায্য পাঠানো বৃদ্ধি এবং জিএইচএফ পরিচালিত বিতরণকেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি।
এ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ভেতরেও ব্যাপক প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে সরকারের পদক্ষেপের বিরোধিতা করে বিক্ষোভ করছেন, তাঁদের দাবি—এই পদক্ষেপ জিম্মিদের জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলবে। আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, তিনি এই পরিকল্পনা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন।
অন্যদিকে, নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডরোথি শিয়া বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিরলসভাবে জিম্মিদের মুক্তি ও যুদ্ধের অবসানে কাজ করে যাচ্ছে, অথচ এ ধরনের বৈঠক সেই প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তিনি দাবি করেন, হামাস যদি আজই জিম্মিদের মুক্তি দেয়, তাহলে যুদ্ধও অবিলম্বে শেষ হতে পারে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, নিরাপত্তা পরিষদের কিছু সদস্য এই বৈঠককে ব্যবহার করে ইসরায়েলকে গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করার চেষ্টা করছে, যা তাঁর মতে “সম্পূর্ণ মিথ্যা”।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত হামলায় গাজায় এ পর্যন্ত ৬১ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজার বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি ভূখণ্ডগত বিরোধ নয়, বরং গভীর মানবিক বিপর্যয়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে, যেখানে যুদ্ধ, অনাহার ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অচলাবস্থা মিলেমিশে তৈরি করেছে ভয়াবহ অনিশ্চয়তা।