প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগে নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন এক সুদর্শন, রোমান্টিক ও দর্শকনন্দিত নায়ক—শাকিল খান। ১৯৯৪ সালে শোবিজ দুনিয়ায় প্রবেশ করলেও ১৯৯৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তার প্রথম চলচ্চিত্র থেকেই তিনি দর্শকদের মনে জায়গা করে নেন। ফটোশুট, ম্যাগাজিন আড্ডা কিংবা শুটিং সেট—সব জায়গাতেই ছিল তার সরল অথচ আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি। অভিনয়, সংলাপ, নাচ, গান ঠোঁট মেলানো, এমনকি কোরিওগ্রাফি ও সিনেমার স্ক্রিপ্ট রচনায়ও তার দক্ষতা ছিল সমান তালে। এ কারণেই অনেকেই তাকে তৎকালীন সময়ে “প্যাকেজ শিল্পী” বলতেন।
রোমান্টিক ছবিতে স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় এবং ইনোসেন্ট লুকের জন্য শাকিল খান ছিলেন নির্মাতাদের প্রথম পছন্দ। তার অভিনয়ে ছিল একধরনের স্বকীয়তা, যা তাকে সমসাময়িক নায়কদের ভিড়ে আলাদা করে তুলেছিল। ক্যারিয়ার খুব দীর্ঘ না হলেও, তিনি অল্প সময়েই ঢাকাই চলচ্চিত্রে দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেছিলেন। তবে ক্যারিয়ারের শীর্ষ সময়ে তার আড়াল হয়ে যাওয়া দর্শকদের কাছে এক ধরনের আফসোসের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। শাকিল খান অবশ্য এ নিয়ে অভিমানী নন। তার ভাষায়, “আমি কখনও চলচ্চিত্র থেকে হারিয়ে যাইনি। হয়তো অভিনয়ে কম সময় দিয়েছি, কিন্তু নির্মাণের সাথে থেকেছি সবসময়। প্রযোজনায় সহায়তা করেছি, স্ক্রিপ্টে হাত দিয়েছি, এমনকি নিজের নাম ছাড়াই সিনেমার জন্য অর্থ দিয়েছি। শুধু প্রচার করিনি।”
তিনি জানান, অনেক সিনেমা তার করার কথা থাকলেও সহ-অভিনেতাদের আবদারে সেগুলো ছেড়ে দিয়েছেন। এমনকি কিছু জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে নেপথ্য অবদান রেখেও নিজের নাম প্রকাশ করেননি। শাকিল খান বলেন, “আমি হয়তো আরও অনেক সিনেমা করতে পারতাম, কিন্তু দর্শক আজ যেভাবে আমাকে ভালোবাসে, তখন হয়তো তা হতো না।”
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তিনি নাটক, টিভি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা এবং বাংলাদেশ টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের সেন্সর বোর্ডের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যবসা ক্ষেত্রেও যুক্ত হলেও চলচ্চিত্র থেকে পুরোপুরি সরে যাননি। শিল্পী সমিতির নির্বাচনেও অংশ নিয়েছেন এবং শিল্পীদের পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন সবসময়।
শাকিল খান ও শাবনূরের জুটি নব্বই দশকে ঢাকাই চলচ্চিত্রে এক অনন্য জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিল। সেই সময়ের ভিসিআর দোকানগুলোতে তাদের সিনেমা দেখতে দর্শকদের ভিড় ছিল উপচে পড়া। শাবনূর ছাড়াও পূর্ণিমা, মৌসুমী ও পপির সঙ্গে তার রোমান্টিক জুটি ছিল দর্শকের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে। পপির সঙ্গে তার অভিনীত সিনেমা এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে চলচ্চিত্রপাড়ায় “শাকিল-পপি জুটি” নিয়ে আলাদা আলোচনা হতো।
তার অভিনীত গান যেমন ‘ভালো বেসে অন্তরে অন্তরে’, ‘প্রতিদিন তোমাকে আমি চাই’, কিংবা ‘ঘুমিয়ে থাকো গো সজনী’—আজও দর্শকদের মনে জায়গা করে আছে। বিশেষ করে শাকিল খানের গিটার হাতে অভিনয় বা হালকা মাথা নেড়ে সংলাপ বলার ভঙ্গি দর্শকদের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে।
এখনও অনেক দর্শক মানতে চান না যে শাকিল খান সিনেমায় নিয়মিত নেই। তিনিও অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করতে নারাজ। তার ভাষায়, “এ চলচ্চিত্র দিয়েই মানুষ আমাকে চেনেন। আমি কীভাবে চলচ্চিত্রকে বিদায় নিতে পারি? খুব শিগগিরই হয়তো দর্শক আবার আমাকে নতুন লুকে পর্দায় দেখবেন।”
‘আমার ঘর আমার বেহেশত’, ‘মা যখন বিচারক’, ‘এ মন তোমাকে দিলাম’, ‘বিয়ের ফুল’, ‘পাহাড়াদার’ ও ‘মগের মুল্লুক’—এসব সিনেমা তার অভিনয়জীবনের সেরা দৃষ্টান্ত। নিজের প্রাপ্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি কিছু পেতে আসিনি। কিন্তু দর্শকের যে ভালোবাসা পেয়েছি, তা আমার কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। এই ভালোবাসা নিয়েই আমি সারা জীবন বাঁচতে চাই।”
শাকিল খানের গল্প প্রমাণ করে, একজন শিল্পী যখন পর্দায় থাকেন বা থাকেন না, তবু যদি তার শিল্প ও অবদান মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে, তবে তিনি কখনও হারিয়ে যান না—শুধু অপেক্ষা থাকে আবার নতুন করে ফিরে আসার।