প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক।একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ভালোবাসা, সংসার, সন্তান—সবই থাকার পরও অনেক মানুষ কেন পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে? প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও এর উত্তর অত্যন্ত জটিল। সম্পর্কের সবচেয়ে বিতর্কিত, সংবেদনশীল ও গভীর এক অধ্যায়ের নাম পরকীয়া, যা যুগে যুগে সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় কাঠামোতে আলোচিত হয়েছে। বিবাহের ধারণা যত পুরোনো, পরকীয়ার অস্তিত্বও তত পুরোনো। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর কারণ, রূপ ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া অনেকটাই বদলেছে।
বিশ্বজুড়ে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণা বলছে, মানুষ কেবল শারীরিক আকর্ষণ বা যৌন ইচ্ছার কারণে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে না। কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনফিডেলিটি রিকভারি ইনস্টিটিউটের গবেষকদের মতে, ভালোবাসা না পাওয়া, গুরুত্ব হারানো, মানসিক সমস্যায় ভোগা, নতুন অভিজ্ঞতার আকাঙ্ক্ষা বা সম্পর্কের একঘেয়েমি থেকেও মানুষ অন্য সম্পর্কে জড়াতে পারে। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক সময় মানুষ পরকীয়া শুরু করে নিছক কৌতূহল থেকে কিংবা অচেনা কারও কাছে নিজের গুরুত্ব পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়।
যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডিলান সেলটারম্যান একাধিক সমীক্ষায় দেখিয়েছেন, পরকীয়ার কারণ সব সময় দাম্পত্য অসন্তুষ্টি নয়। সুখী সম্পর্কেও সঙ্গীর একজন নতুন বৈচিত্র্য, উত্তেজনা বা নতুন অভিজ্ঞতার খোঁজে পরকীয়ায় জড়িয়ে যেতে পারেন। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিনসি ইনস্টিটিউটের রিসার্চ ফেলো ও যৌন আচরণবিষয়ক গবেষক ড. জাস্টিন লেমিলার তার বই টেল মি হোয়াট ইউ ওয়ান্ট-এ উল্লেখ করেছেন, পরকীয়া অনেক সময় সম্পর্কের শূন্যতা পূরণে সাহায্য করে। এটি সবসময় স্বার্থপরতার প্রকাশ নয়, বরং মানসিক একাকিত্ব, অবহেলা বা ভালোবাসার ঘাটতি মেটানোর প্রয়াসও হতে পারে।
কানাডার ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অ্যামি রোকাচের মতে, মানুষ সামাজিক ও মানসিকভাবে বহুমাত্রিক চাহিদার অধিকারী। এক সঙ্গী সব সময় একজনের সব প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন না। সেক্ষেত্রে অন্য কারও সঙ্গে আবেগ ভাগাভাগি করা বা সাময়িক মানসিক প্রশান্তি খোঁজাই অনেক সময় পরকীয়ার পথে ঠেলে দেয়।
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি জটিল। বহু সমাজে পরকীয়া কেবল নৈতিকতা বা পারিবারিক কাঠামোর প্রতি হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়। আবার কিছু সমাজে গোপন হলেও এটি একটি সাধারণ বাস্তবতা। দক্ষিণ এশিয়ায় সামাজিক ট্যাবুর কারণে বিষয়টি প্রকাশ্যে আলোচনায় আসে কম, তবে গবেষণা বলছে, এর উপস্থিতি উপেক্ষা করার মতো নয়।
বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে পারিবারিক জীবনে চাপ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যমও পরকীয়ার বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষকে যেমন দ্রুত সংযোগ ঘটাতে সাহায্য করছে, তেমনি নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার পথও খুলে দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, পরকীয়া শুধুমাত্র শারীরিক সম্পর্কের বিষয় নয়, বরং এটি মানুষের মানসিক, সামাজিক ও আবেগীয় জীবনের জটিলতার বহিঃপ্রকাশ। গবেষকেরা একমত যে, এর কারণ একক নয়; বরং ব্যক্তি, সম্পর্ক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের বহুবিধ উপাদান মিলেই মানুষকে এই পথে নিয়ে যায়।