প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তে বিস্তৃত বঙ্গোপসাগরের তীরে প্রকৃতির এক অপার বিস্ময় কুয়াকাটা। সাগরকন্যা খ্যাত এই সমুদ্র সৈকত সৌন্দর্যের কারণে দেশি-বিদেশি ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বহু বছর ধরেই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপালী ইউনিয়নে অবস্থিত এ সৈকতই বাংলাদেশের একমাত্র স্থান, যেখান থেকে একইসঙ্গে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করা যায়। ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সমুদ্র সৈকতের প্রতিটি কোণেই লুকিয়ে আছে ভ্রমণার্থীদের জন্য নতুন নতুন অভিজ্ঞতা।
কুয়াকাটার পূর্ব প্রান্তে গঙ্গামতির বাঁক থেকে সূর্যোদয়ের দৃশ্য পর্যটকদের বিমোহিত করে, আর পশ্চিম প্রান্তের সৈকত সূর্যাস্তের সোনালী আভায় মুগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে দেয়। দীর্ঘ নারিকেল গাছের সারি সৈকতের সৌন্দর্য বাড়ালেও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ইতিমধ্যেই এই গাছপালার অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। জোয়ারের বাড়তি চাপ ও ভাঙন অনেক জায়গায় বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে প্রতিদিনই এখানে দেখা যায় জেলেদের মাছ ধরার ব্যস্ততা, যা সমুদ্রকেন্দ্রিক জীবনের বাস্তব চিত্রকে ফুটিয়ে তোলে।
কুয়াকাটা কেবল সমুদ্র সৈকতের জন্যই নয়, বরং এর আশপাশের অনন্য বৈচিত্র্যপূর্ণ স্থানের জন্যও খ্যাত। সৈকতের পশ্চিম প্রান্তের জেলে পল্লীতে নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত শুঁটকি তৈরির মৌসুম চলে। এখানে জেলেরা নিজেরাই সমুদ্র থেকে মাছ ধরে সৈকতে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করেন। পর্যটকেরা চাইলে তুলনামূলক কম দামে ভালো মানের শুঁটকি কিনতে পারেন।
পূর্বদিকে রয়েছে গঙ্গামতির খাল, যেখান থেকে শুরু হয় গঙ্গামতির জঙ্গল। স্থানীয়ভাবে গজমতি নামেও পরিচিত এই বনভূমিতে রয়েছে বিচিত্র বৃক্ষরাজি ও বন্যপ্রাণী। এখানে বানর, বন মোরগ, নানা প্রজাতির পাখি এমনকি শিয়াল ও অন্যান্য ছোট প্রাণীর দেখা মেলে। এর কিছুটা দূরেই আছে ক্রাব আইল্যান্ড বা কাঁকড়ার দ্বীপ। শীতকালীন ভ্রমণ মৌসুমে পর্যটকেরা স্পিডবোটে সেখানে গিয়ে লাল কাঁকড়ার অসংখ্য ঝাঁক দেখে মুগ্ধ হন, যারা নির্জন সৈকতকে মুহূর্তেই লাল রঙে ঢেকে ফেলে।
অন্যদিকে, সৈকতের পশ্চিমে নদী পার হলেই চোখে পড়বে ফাতরার বন। সুন্দরবনের মতো শ্বাসমূলীয় এই বনাঞ্চলে হিংস্র প্রাণীর উপস্থিতি নেই বললেই চলে। তবে বন মোরগ, বানর, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এবং মাঝে মাঝে বুনো শুকর এখানে দেখা যায়। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ভ্রমণকারীরা সহজেই এ বনে যেতে পারেন।
কুয়াকাটার ইতিহাসও কম আকর্ষণীয় নয়। জনশ্রুতি রয়েছে যে ১৭৮৪ সালে বর্মী আক্রমণের পর রাখাইন জনগোষ্ঠী আরাকান থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে এখানে আশ্রয় নেয়। লোনা জলের এলাকায় তারা পানীয় জলের প্রয়োজন মেটাতে একটি কূপ খনন করেন। সেই কূপের নাম থেকেই এ এলাকার নামকরণ হয় কুয়াকাটা। যদিও কূপটি এখনও বিদ্যমান, অদূরদর্শী সংস্কারের কারণে এর অনেকটাই সৌন্দর্য হারিয়েছে।
কুয়াকাটায় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক নিদর্শনও রয়েছে। প্রাচীন কুয়ার সামনে সীমা বৌদ্ধ মন্দিরে রয়েছে অষ্টধাতুর তৈরি একটি বিশাল বুদ্ধমূর্তি। কাছেই কেরানিপাড়া, যেখানে রাখাইন জনগোষ্ঠীর নারীরা ঐতিহ্যবাহী তাঁতের কাপড় বুননে ব্যস্ত থাকেন। শীতকালে তাদের তৈরি চাদর ভ্রমণকারীদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয়। এছাড়া মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ মন্দির এবং আমখোলা গ্রামের রাখাইন বসতি কুয়াকাটার ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। কথিত আছে, মিশ্রিপাড়ার মন্দিরে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ বুদ্ধমূর্তি রয়েছে।
কুয়াকাটায় যেতে ঢাকা থেকে নৌপথ ও সড়কপথ উভয়ই ব্যবহার করা যায়। সদরঘাট থেকে এমভি পারাবত, এমভি সৈকত ও এমভি সুন্দরবনসহ বিভিন্ন লঞ্চে পটুয়াখালী যাওয়া যায়, সেখান থেকে বাসযোগে সহজেই পৌঁছানো সম্ভব কুয়াকাটায়। লঞ্চের কেবিন ভাড়া ৮০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে কেবিনের ধরন অনুযায়ী কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
কুয়াকাটা আজ কেবল একটি ভ্রমণকেন্দ্র নয়, বরং এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন। সমুদ্রের গর্জন, সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের দৃশ্য, রাখাইন সংস্কৃতি, বনভূমি আর জেলে জীবনের বাস্তবতা সব মিলিয়ে কুয়াকাটা সত্যিই সাগরকন্যা খ্যাতির উপযুক্ত দাবিদার।