প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে একটি রাজনৈতিক কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে গঠিত এই কার্যালয় নিয়ে ঢাকাসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা। একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দিল্লির এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভয়াবহ হস্তক্ষেপ এবং কার্যত এক ধরনের যুদ্ধ ঘোষণার সমতুল্য।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, শেখ হাসিনা বর্তমানে দিল্লির একটি উচ্চমাত্রায় সুরক্ষিত ভবনে অবস্থান করছেন এবং সেই ভবনেই আধুনিক কমিউনিকেশন সুবিধাসহ একটি সচিবালয় গড়ে তোলা হয়েছে। সচিবালয়ের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলে বার্তা পাঠানো হচ্ছে। শেখ হাসিনার হয়ে এই কাজগুলো পরিচালনার জন্য একজন প্রভাবশালী বাঙালি সাংবাদিককেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যিনি বিভিন্ন মহলে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করতে ইতোমধ্যে লন্ডনে একটি লবিং ফার্মও নিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘে আবেদন করার জন্য যুক্তরাজ্যের খ্যাতনামা দুই আইনজীবী স্টিভেন পলস কেসি এবং অ্যালেক্স টিনসেলেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা যুক্তি দেখাচ্ছেন, অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী কাজ করেছে, ফলে দলটি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ হারাতে পারে। জাতিসংঘ যেন এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বাংলাদেশকে চাপ দেয়—এমনটাই তাদের দাবি।
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দিল্লিতে তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবীর নানক, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এবং সুজিত রায় নন্দী। এসব তৎপরতা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার কৌশল অনুযায়ীই চলছে এবং পুরো বিষয়টির ওপর সরাসরি নজর রাখছেন অজিত দোভাল।
এদিকে দিল্লি প্রেস ক্লাবের সভাপতি গৌতম লাহিড়ী সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, শেখ হাসিনা দিল্লিতে একজন প্রধানমন্ত্রীর মতোই অবস্থান করছেন এবং তাকে সেই মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, শেখ হাসিনা এ বছরই বাংলাদেশে ফিরবেন এবং দেশের অভ্যন্তরে অভ্যুত্থানের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন। তার এসব মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর বিশ্লেষকদের মতে, ভারত আসলে বাংলাদেশে জনমত যাচাই করতে চাইছে এবং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার জন্য মাটিকে প্রস্তুত করছে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. দিলারা চৌধুরী দিল্লির পদক্ষেপকে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বলেছেন। তার মতে, ভারত এখনও ১৯৭১ সালের পরবর্তী মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি এবং তারা এখনো বাংলাদেশে নিজেদের পছন্দের সরকার বসাতে চাইছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ভারত সীমান্তে উত্তেজনা বাড়াতে পারে, পার্বত্যাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে এবং অভ্যন্তরে অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে নাশকতা চালাতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর ড. মাহবুব উল্লাহ বলেছেন, শেখ হাসিনার জন্য দিল্লিতে রাজনৈতিক কার্যালয় স্থাপন দালাইলামা মডেলের প্রতিফলন। ভারতের আধিপত্যবাদী মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ এটি। তিনি মনে করেন, শেখ হাসিনাকে ভারত শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, আর্থিকভাবেও সহায়তা দেবে এবং দীর্ঘমেয়াদে তাকে আশ্রয় দিয়ে রাখবে।
অন্যদিকে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, দিল্লি এখন কার্যত দ্বিধায় রয়েছে। তারা অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে গ্রহণ করতে পারছে না, আবার বিএনপিকেও পুরোপুরি বিশ্বাস করছে না। ফলে শেখ হাসিনাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য দিল্লিতে রেখে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারত। এতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি আরও অস্থির হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
সব মিলিয়ে দিল্লিতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয় প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ শুধু আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের প্রচেষ্টা নয়, বরং বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের ওপর এক সরাসরি চাপ সৃষ্টি করার কৌশল। এর মোকাবিলায় দেশের সব রাজনৈতিক শক্তির ঐক্য অপরিহার্য হয়ে উঠছে










