প্রকাশ: ২৬শে জুন ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ইরানের আকাশে যখন গভীর রাতের নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল, তখন নিঃশব্দে প্রবেশ করে যুক্তরাষ্ট্রের ছয়টি বি-২ স্পিরিট স্টেলথ বোমারু বিমান। “অপারেশন মিডনাইট হ্যামার” নামের এই গোপন অভিযানে ইরানের ফরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়। মিসৌরির হোয়াইটম্যান এয়ার ফোর্স বেস থেকে প্রায় ১৮ ঘণ্টা উড্ডয়ন শেষে এই বোমারু বিমানগুলো ইরানের আকাশে পৌঁছায়। তাদের সঙ্গ দেয় ১২৫টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ও একটি জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, যা ইতিহাসের প্রথম “সেভেন সীপ ফর্মেশন”-এ অংশ নেয়।
এই অভিযানের বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, প্রতিটি বি-২ বিমান ৩০,০০০ পাউন্ড ওজনের দুটি করে জিবিইউ-৫৭ বাঙ্কার বাস্টার বোমা বহন করেছিল, যা মাটির গভীরে প্রবেশ করে পারমাণবিক সুবিধাগুলো ধ্বংস করার জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা। “সিকোয়েনশিয়াল পেনিট্রেশন” কৌশল প্রয়োগ করে প্রথম বোমা দিয়ে পাহাড়ের ভেতরে পথ তৈরি করা হয়, যাতে পরের বোমাটি আরও গভীরে প্রবেশ করতে পারে। বিমানগুলো অপারেশন শেষে নিরাপদে মিসৌরিতে ফিরে গেলে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার কথা ঘোষণা করেন এবং দাবি করেন যে ফরদো সম্পূর্ণরূপে “ধ্বংস হয়ে গেছে”।
তবে এই হামলার প্রকৃত সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হামলার দুদিন আগের উপগ্রহ চিত্রে ফরদো পারমাণবিক স্থাপনার দিকে একটি বিশাল কনভয় চলাচলের ছবি ধরা পড়ে। কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, ইরান সম্ভবত ইউরেনিয়াম ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি সরিয়ে নিয়েছে, যা আমেরিকার এই হামলাকে আংশিকভাবে ব্যর্থ করে দিয়েছে। আবার অন্যরা বলছেন, এই কনভয় সম্ভবত একটি ডিকয় কৌশল ছিল, যার মাধ্যমে ইরান আমেরিকাকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছে।
এই হামলার পরিণতি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দ্বিমত দেখা দিয়েছে। কিছু বিশ্লেষক বলছেন, যদি ইরানের পারমাণবিক সুবিধাগুলো সত্যিই ধ্বংস হয়ে থাকে, তাহলে তাদের পরমাণু কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করতে কয়েক বছর লেগে যাবে। এতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইরানের ওপর নজরদারি বাড়ানোর সুযোগ পাবে। তবে অন্যরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, ইরান যদি আগে থেকে ইউরেনিয়াম ও যন্ত্রপাতি সরিয়ে ফেলে থাকে, তাহলে এই হামলা শুধু অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তাদের প্রকৃত পারমাণবিক সক্ষমতা অক্ষত রয়েছে। এমনকি এই হামলা ইরানকে আরও দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়নের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এই ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। ইরানের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না এলেও, তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এই হামলাকে “আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন” বলে নিন্দা জানিয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা এই হামলাকে সমর্থন জানালেও কিছু দেশ এর নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এই হামলার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আসলে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে? উত্তরটি শুধু ইরান-আমেরিকা সম্পর্কই নির্ধারণ করবে না, বরং পুরো মধ্য প্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে উপগ্রহ চিত্র ও গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে এই হামলার প্রকৃত প্রভাব সম্পর্কে। তবে একথা নিশ্চিত যে, এই ঘটনা বিশ্বকে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।