প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার সাধারণ এক শ্রমিক জসিম মিয়া এখন মৃত্যুভয় আর অমানবিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন পার করছেন। মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক গুলি বিঁধে থাকা অবস্থায় তিনি প্রায় অচল হয়ে পড়েছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, উন্নত চিকিৎসা ছাড়া তার বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। কিন্তু অর্থাভাবে এই চিকিৎসা করানো তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
জসিম মিয়া মূলত একজন ব্যাটারিচালিত রিকশা শ্রমিক। প্রতিদিনের আয়ে সংসার চলত, স্ত্রী ও পাঁচ বছরের প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে ছোট ভাড়াবাসায় কোনো রকমে দিন গুজরান করতেন। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মৌলভীবাজার শহরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সঙ্গে এক বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দেন তিনি। চৌমুহনায় মিছিলকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার একপর্যায়ে চাঁদানীঘাট সেতুর ওপরে অবস্থান নেওয়া জসিম ও অন্যরা পুলিশের গুলিতে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। টিয়ারশেল, রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেডের পর পুলিশ সরাসরি গুলি চালালে মাথা, হাত, পা, উরু ও শরীরের বিভিন্ন অংশে প্রায় দুইশর মতো গুলি লাগে জসিমের শরীরে। তখনই তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। স্থানীয় কয়েকজন মিলে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কয়েকটি গুলি বের করা সম্ভব হলেও অধিকাংশ এখনো শরীরের ভেতর রয়ে গেছে।
সেই থেকে তার জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। চোখে ঝাপসা দেখা, শ্বাসকষ্ট ও শরীরব্যাপী তীব্র ব্যথা তাকে কর্মহীন করে দিয়েছে। একসময় রিকশা চালিয়ে সংসার চালালেও এখন আর তা সম্ভব নয়। চিকিৎসার খরচ জোগাতে নিজের রিকশাটিও বিক্রি করে দিয়েছেন, কিন্তু চিকিৎসা শেষ হয়নি। মৌলভীবাজার সদর হাসপাতাল থেকে তাকে সিলেট সিএমএইচে পাঠানো হলেও গেজেটভুক্ত না হওয়ায় সেখানে ভর্তি হতে পারেননি। সরকারি বা বেসরকারি কোনো সাহায্যও এখন পর্যন্ত তার ভাগ্যে জোটেনি।
তার ছোট বোন সাংবাদিক নাসরিন প্রিয়া জানান, ভাইয়ের শরীরে গুলি থাকা অবস্থায় দিন দিন শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। অথচ চিকিৎসা ব্যয়ভার বহন করার মতো সামর্থ্য তাদের নেই। তিনি বলেন, আন্দোলনে আহত হওয়ার পর থেকে ভাই আর কাজ করতে পারছেন না, সংসার চালানোই এখন কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
জসিম নিজেও এক সাক্ষাৎকারে আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, “আমার শরীরের মধ্যে এখনো শতাধিক গুলি রয়েছে। ডাক্তাররা বলেছেন অপারেশন ছাড়া সেগুলো বের করা সম্ভব নয়। কিন্তু সেই চিকিৎসার খরচ বহন করার মতো টাকা আমার নেই। সরকারি সহযোগিতা ছাড়া আমার পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।”
গ্রামীণ পটভূমি থেকে উঠে আসা এই শ্রমিক একসময় পরিবার ও সমাজের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন। আন্দোলনে অংশ নিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করার পর আজ তিনি অসহায় হয়ে পড়েছেন। তার মা-বাবা কাঁদতে কাঁদতে নাতি ও ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। এ যেন শুধু একজন শ্রমিকের ব্যক্তিগত বেদনা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অবহেলার এক নির্মম চিত্র।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, জসিম মিয়ার মতো মানুষের জীবনের দায়ভার কে নেবে? সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা সরকারি কোনো উদ্যোগ না এলে হয়তো শতাধিক গুলি বুকে নিয়েই ধীরে ধীরে নিভে যাবে এক শ্রমিকের জীবনপ্রদীপ। তাই তিনি এবং তার পরিবার জরুরি ভিত্তিতে সরকারি সহায়তা ও মানবিক সহযোগিতা কামনা করেছেন।