প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বেসরকারি খাত, তৈরি পোশাকশিল্প, জনশক্তি রপ্তানি এবং কৃষি খাতকে বিবেচনা করা হয়। স্বাধীনতার পর দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে ধারা তৈরি হয়েছে, তা মূলত এই চারটি খাতের বিকাশের মাধ্যমেই দৃশ্যমান হয়েছে। তবে এসব খাতের উত্থান এবং বিকাশের পেছনে যে নীতি, দিকনির্দেশনা ও রাজনৈতিক প্রেরণা কাজ করেছে, তার উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর হাত ধরে। বিশেষ করে জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতির মজবুত ভিত রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বিএনপি ইতোমধ্যে রাজনীতিতে ৪৭ বছর অতিক্রম করেছে এবং দলটি সম্প্রতি তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করেছে। দেশের অর্থনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর যে দিশাহীন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, তা থেকে উত্তরণের পথ তৈরি হয় মূলত বিএনপির সময়কালে। অর্থনীতিবিদ, বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ী নেতাদের বক্তব্য অনুসারে, আজকের বাংলাদেশ যেসব অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তার সূচনা হয়েছিল বিএনপির উদ্যোগের মাধ্যমেই।
অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহর মতে, জিয়াউর রহমানের আমলেই দেশে তৈরি পোশাকশিল্পের ভিত্তি তৈরি হয় এবং জনশক্তি রপ্তানির যাত্রা শুরু হয়। কৃষিক্ষেত্রে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে তিনি গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেন। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ড. আবু আহমেদ মনে করেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানার নামে জাতীয়করণ নীতি স্বাধীনতার পর অর্থনীতিকে স্থবির করে দিয়েছিল। সেই সংকট কাটিয়ে জিয়াউর রহমান বেসরকারিকরণ নীতি গ্রহণ করেন এবং উদ্যোক্তাদের হাতে শিল্পকারখানা ফিরিয়ে দেন, যা পরবর্তীতে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তিতে পরিণত হয়।
অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা রক্ষা ও সংস্কারে বিএনপি সরকারের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার মুক্তবাজার অর্থনীতি গ্রহণ করে এবং ভ্যাটব্যবস্থা চালু করে। ভ্যাট বর্তমানে সরকারের রাজস্ব আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে কাজ করছে, যা দেশের বাজেট বাস্তবায়নে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। খালেদা জিয়ার সময়কালে আর্থিক খাতেও স্থিতিশীলতা বজায় ছিল, খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল সীমিত, এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
বিএনপির অর্থনৈতিক অবদান নিয়ে ব্যবসায়ী মহলেও ইতিবাচক মন্তব্য পাওয়া যায়। ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খান বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় ৮০ শতাংশ অবদান বিএনপির নীতির ফলশ্রুতি। বেসরকারি খাতের বিকাশ, খাল খননের মাধ্যমে কৃষির উন্নয়ন এবং জনশক্তি রপ্তানি—এসবের মাধ্যমে গ্রামীণ ও জাতীয় অর্থনীতি গতিশীল হয়েছে।
বিএনপির অর্থনৈতিক কর্মসূচির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ। জিয়াউর রহমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমাতে তথ্য, শিক্ষা ও প্রেষণা (আইইএম) কর্মসূচি চালু করেন। এ কর্মসূচির আওতায় নিয়োজিত কর্মীরা সরাসরি গ্রামীণ পরিবারে গিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতেন এবং বিনামূল্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণ সরবরাহ করতেন। এ উদ্যোগ দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক সাফল্য এনে দেয়।
স্বাধীনতার পর অর্থনীতির ভঙ্গুর অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ তৈরি হয়েছিল মূলত জিয়াউর রহমানের শাসনামলে। জাতীয়করণের অকার্যকর নীতি পরিত্যাগ করে তিনি শেয়ারবাজার পুনরায় চালু করেন, কৃষিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করেন এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বিশেষ উদ্যোগ নেন। ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের পর বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা ছিল এক বিশাল অর্জন। এমনকি জিয়াউর রহমানের সময়কালে বাংলাদেশ চাল রপ্তানির নজিরও স্থাপন করে।
বর্তমানে রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাকশিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল জিয়াউর রহমানের নীতিগত সহায়তায়। বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধা চালুর মাধ্যমে এই খাত দ্রুত বিকশিত হয় এবং আজ দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ৮৫ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। একইভাবে প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার আরেকটি বড় ভাণ্ডার তৈরি হয়েছে, যা শুরু হয়েছিল জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে।
অর্থনীতির এই ভিত্তিগুলো নির্মাণে বিএনপির ভূমিকা অনস্বীকার্য। স্বাধীনতার পর যে অর্থনীতি দুর্বল, অকার্যকর এবং রাজনৈতিক দুর্নীতিতে জর্জরিত ছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে আজকের বাংলাদেশ যে প্রবৃদ্ধি ও সম্ভাবনার পথে এগিয়ে চলেছে, তার পেছনে বিএনপি-উদ্যোগে নেওয়া নীতি ও সিদ্ধান্তই প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে।