প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বলিউডের জনপ্রিয় নায়িকা দিশা পাটানি আবারও শিরোনামে উঠে এলেন, তবে এবার তার সাফল্য বা গ্ল্যামারের কারণে নয়, বরং এক ভয়াবহ ঘটনার কারণে। উত্তর প্রদেশের বেরেলিতে তার পরিবারের বাড়িকে উদ্দেশ্য করে গুলি চালানো হয়েছে, যা পুরো বলিউডে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। মাত্র এক বছর আগে সুপারস্টার সালমান খানের মুম্বাইয়ের বাড়িতে গুলি চালানো হয়েছিল, আর এবার সেই একই কায়দায় দিশার বাড়িকে টার্গেট করা হয়েছে। ঘটনায় ভারতের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
শুক্রবার (১২ সেপ্টেম্বর) ভোররাতে, প্রায় ৩টার দিকে, মোটরসাইকেলে আসা দুই অজ্ঞাত ব্যক্তি বেরেলির সিভিল লাইনসে অবস্থিত দিশা পাটানির বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে টানা দুটি গুলি চালায়। সৌভাগ্যক্রমে কেউ হতাহত হয়নি। গুলি চালিয়ে মুহূর্তেই তারা স্থান ত্যাগ করে। ঘটনার শব্দ শুনে আশেপাশের মানুষজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং পুলিশকে খবর দেন। খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস।
তদন্তে নেমে পুলিশ প্রথমে বিষয়টিকে এক প্রকার ভয় দেখানোর কৌশল হিসেবে ধরে নেয়। কিন্তু ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গ্যাংস্টার গোল্ডি ব্রার ও রোহিত গোদারা দায় স্বীকার করে একটি পোস্ট ছড়িয়ে দেয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। পোস্টে দাবি করা হয়, অভিনেত্রীর পরিবার নাকি একাধিক আধ্যাত্মিক গুরুকে অসম্মান করেছেন, বিশেষ করে প্রেমানন্দ ও অনিরুদ্ধাচার্যের মতো ধর্মীয় নেতাদের। সেই কারণেই তাদের ‘শিক্ষা দেওয়ার জন্য’ এই হামলা চালানো হয়েছে।
পোস্টে আরও লেখা হয়, “এটি কেবল একটি ট্রেলার ছিল। পরবর্তী সময়ে যদি আমাদের ধর্ম বা সাধুদের কেউ অবমাননা করে, তবে তাকে আর জীবিত রাখা হবে না। এ বার্তা শুধু দিশার জন্য নয়, বলিউডের অন্যান্য শিল্পীদের জন্যও।” বার্তাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বলিউডের অনেক তারকা শঙ্কিত হয়ে পড়েন।
এই ঘটনার সাথে সালমান খানের বাড়িতে গুলি চালানোর ঘটনার মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে সালমানের গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টে একইভাবে গুলি চালানো হয়েছিল। তখনও দায় স্বীকার করে গোল্ডি ব্রার ও লরেন্স বিষ্ণোই। সালমানের ক্ষেত্রে বিষয়টি ব্যক্তিগত শত্রুতা হিসেবে ধরা হলেও, দিশার ক্ষেত্রে পুরো ঘটনাকে ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে জড়ানো হয়েছে।
দিশা পাটানি নিজে এখনও পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তার বড় বোন খুশবু পাটানির নাম এ ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছে। জানা গেছে, খুশবু সম্প্রতি এক আধ্যাত্মিক নেতার বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন। ওই নেতা লিভ-ইন সম্পর্ক ও আধুনিক নারীদের নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বিতর্কিত ভাষা ব্যবহার করেছিলেন। তিনি বলেন, “২৫ বছরের নারীরা এরই মধ্যে চার-পাঁচ জন পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে।” এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে খুশবু সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, “এই লোকটা দেশদ্রোহী ও নারীবিদ্বেষী। সমাজের দুর্বল মানুষজনই তাকে অনুসরণ করছে।”
খুশবু একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা এবং সামাজিক মাধ্যমে তার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। তার এই প্রকাশ্য সমালোচনা থেকেই গ্যাংস্টার চক্র দিশার পরিবারের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গুলি চালনার ঘটনাকে তাই শুধুই ভয় দেখানো নয়, বরং প্রতিশোধের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে দিশার বাড়ির সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিবারকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রাখা হয়েছে এবং গোটা এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। স্থানীয় পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে গুলির খোসা সংগ্রহ করেছে এবং প্রাথমিক ফরেনসিক পরীক্ষায় দেখা গেছে এগুলো দেশীয় পিস্তল থেকে ছোঁড়া।
উত্তর প্রদেশ পুলিশ জানিয়েছে, তারা গুলি চালানো দুজন মোটরসাইকেল আরোহীর সন্ধানে তল্লাশি চালাচ্ছে। শহরের প্রবেশ ও প্রস্থান পথগুলোতে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত দায় স্বীকারের পোস্টটির সত্যতা যাচাই করছে সাইবার ক্রাইম ইউনিট।
ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনেও ঘটনাটি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিরোধীদলীয় নেতারা বলছেন, দেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটছে এবং বিখ্যাত তারকারাও আর নিরাপদ নন। অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঘটনাটি খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে।
বলিউডে অবশ্য ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সালমান খানের পর দিশা পাটানির বাড়িতে গুলি চালানোর ঘটনায় অনেক তারকাই নিজেদের নিরাপত্তা জোরদার করেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভক্তরাও দিশার পাশে দাঁড়িয়েছেন। তারা তার প্রতি সমর্থন ও সহানুভূতি জানাচ্ছেন। অনেকে আবার এই ঘটনাকে ভারতের সাম্প্রতিক ধর্মীয় বিভাজন ও উগ্র গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্যের সঙ্গে যুক্ত করছেন।
সাংবাদিক মহলে আলোচনায় আসছে যে, গ্যাংস্টার চক্র বলিউডকে টার্গেট করে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করছে। শিল্পীদের জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে তারা নিজেদের ‘বার্তা’ ছড়িয়ে দিতে চাইছে। এই প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে কেবল বলিউডই নয়, সমগ্র ভারতের বিনোদন জগতকেই হুমকির মুখে ফেলে দেবে।
বর্তমানে তদন্তকারীরা দিশা পাটানির পরিবারের সঙ্গে কথা বলছেন। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি, তবুও পুলিশের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে ঘটনাটি রাষ্ট্রবিরোধী ও সংগঠিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
দিশা পাটানি দীর্ঘদিন ধরেই বলিউডে জনপ্রিয় মুখ। তার ফিটনেস, নাচ এবং আধুনিক লাইফস্টাইল তরুণ প্রজন্মকে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করে। জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি গ্ল্যামারের আড়ালে কাটালেও হঠাৎ করেই সহিংসতার টার্গেট হয়ে ওঠা তার পরিবারের জন্য এক বড় ধাক্কা।
এখন প্রশ্ন একটাই—এই গুলি চালনার ঘটনায় দিশা পাটানির পরিবার সত্যিই নিরাপদ তো? পুলিশ ও প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তারই এখন সময়ের দাবি। কারণ একটি ঘটনার রেশ বলিউডের আরও কতজন তারকার জীবনে ছড়িয়ে পড়তে পারে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।