ডাকসু: আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নিলেন সাদিক কায়েম-ফরহাদরা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ১১৭ বার
ডাকসু: আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নিলেন সাদিক কায়েম-ফরহাদরা

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রতীক কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) আজ আবারও নতুনভাবে যাত্রা শুরু করল। রোববার সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন ডাকসুর নবনির্বাচিত প্রতিনিধিরা। এর মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশিত প্রতিনিধি কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো।

আজ সকালে উপাচার্যের কার্যালয় সংলগ্ন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় ডাকসুর কার্যনির্বাহী পরিষদের প্রথম সভা। সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান। নবনির্বাচিত নেতাদের উপস্থিতিতে এটি এক ভিন্ন আবহ সৃষ্টি করে। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে আগ্রহ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, আজকের এই আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণ তার বাস্তবায়নের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

গত ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে শীর্ষ তিন পদসহ মোট ২৮টির মধ্যে ২৩টি পদে জয়ী হন ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থীরা। এতে শিক্ষার্থীদের রায় স্পষ্টভাবেই প্রতিফলিত হয়। তবে ভিন্ন ভিন্ন প্যানেল থেকেও কয়েকজন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন, যা ডাকসুকে আরও বহুমাত্রিক ও সমন্বিত করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

সভায় ভিপি মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম), সাধারণ সম্পাদক এসএম ফরহাদ, সহ-সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন খানসহ অন্য নির্বাচিতরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব অর্পণের মধ্য দিয়ে শুরু হলো ২০২৫ সালের ডাকসুর কার্যক্রম। সভার আগে থেকেই ক্যাম্পাসজুড়ে ছিল এক ধরনের উচ্ছ্বাস ও কৌতূহল। কারণ শিক্ষার্থীদের কাছে এটি কেবল একটি সভা নয়, বরং নতুন নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ।

সভা শেষে জানানো হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য হিসেবে ৫ জন ছাত্র প্রতিনিধির নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। তারা হলেন ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদ, এজিএস মহিউদ্দীন খান, সর্বাধিক ভোট পাওয়া সদস্য সাবিকুন্নাহার তামান্না এবং পরিবহন সম্পাদক আসিফ আবদুল্লাহ। এই মনোনয়নগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ছাত্র প্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে।

সভা শেষে ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, “এর মাধ্যমে আমাদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হলো। আমাদেরকে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করবেন, জবাবদিহিতা চাইবেন। আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করব। এ নির্বাচনে কেউ হারেনি। আমরা সবাই মিলে কাজ করব।” তিনি আরও জানান, শিগগিরই কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করা হবে, যেখানে শিক্ষার্থীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের রূপরেখা উপস্থাপন করা হবে।

জিএস এস এম ফরহাদও একই সুরে বলেন, “আমরা শিক্ষার্থীদের আস্থার প্রতিফলন ঘটাতে চাই। ডাকসু সব সময় শিক্ষার্থীদের অধিকার ও স্বার্থরক্ষার জন্য কাজ করবে। আমরা চাই ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি শক্তিশালী হোক।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন পর ডাকসুর নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত প্যানেলের বড় জয় বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতেও পড়তে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বারোমিটার বলা হয়। ফলে এখানকার নেতৃত্ব ও তাদের কার্যক্রম সব সময় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

ডাকসুর ইতিহাসে ফিরে তাকালে দেখা যায়, এই সংসদ শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানেই ভূমিকা রাখেনি, বরং জাতীয় আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—প্রতিটি বড় মোড়ে ডাকসুর নেতারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। সেই ঐতিহ্যকে সামনে রেখে নতুন নেতৃত্বকে শিক্ষার্থীরা নতুন প্রত্যাশার চোখে দেখছেন।

অতীতের ডাকসু নির্বাচনে জালিয়াতি, দখলদারি বা সহিংসতার অভিযোগ থাকলেও এবারের নির্বাচন তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। যদিও কিছু কেন্দ্র নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল, তবু সামগ্রিকভাবে ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনের পরিবেশ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন আস্থার সঞ্চার করেছে।

এবারের নির্বাচনে বিজয়ী জোট বলছে, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসন, পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির জন্য কাজ করবে। পাশাপাশি মাদকবিরোধী আন্দোলন, সাইবার নিরাপত্তা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও তারা গুরুত্ব দেবে।

শিক্ষার্থীরা আশা করছেন, নতুন নেতৃত্ব বাস্তবিক অর্থে ক্যাম্পাসে পরিবর্তন আনবে। অনেকেই মনে করছেন, ডাকসুর প্রধান কাজ হবে শিক্ষার্থীদের নিত্যদিনের সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখা। যেমন—হলের সিট বণ্টন, লাইব্রেরির মান উন্নয়ন, আধুনিক ক্লাসরুম ও ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত করা এবং নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি ঘটাতে ডাকসুর নেতৃত্ব প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করতে পারে।

অন্যদিকে, সমালোচকরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, অতীতে ডাকসু নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অনেকেই শিক্ষার্থীদের প্রকৃত স্বার্থের চেয়ে রাজনৈতিক দলের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ফলে শিক্ষার্থীদের আস্থা নষ্ট হয়েছে। তাই নতুন কমিটির প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে নিজেদের কর্মতৎপরতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আস্থা পুনর্গঠন করা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান বলেছেন, “ডাকসু সব সময় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতীক। আমি আশা করি, নতুন নেতৃত্ব শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণে সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে।” তিনি ডাকসুর নেতাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অংশীদার হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানান।

রাজনৈতিক মহলে ইতোমধ্যেই আলোচনা চলছে যে, ডাকসুর নতুন নেতৃত্ব জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির বহু শীর্ষ নেতা ডাকসু থেকে উঠে এসেছেন। সাদিক কায়েম, ফরহাদরা সেই ঐতিহ্যের নতুন সংযোজন কিনা—তা সময়ই বলে দেবে।

আজকের এই আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণ তাই কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি ঘটনা। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, নতুন নেতৃত্ব প্রতিশ্রুতির বাইরে গিয়ে কার্যকর কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে পরিবর্তনের সূচনা ঘটাবে। তারা যদি তা করতে সক্ষম হয়, তবে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিও নতুন এক দিশা পেতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত