বরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীনের মৃত্যুতে সংস্কৃতি উপদেষ্টার শোক

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৫৭ বার
বরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীনের মৃত্যুতে সংস্কৃতি উপদেষ্টার শোক

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলা লোকসংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী, লালনগীতির জীবন্ত প্রতীক ফরিদা পারভীন আর নেই। শনিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাত ১০টা ১৫ মিনিটে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময়জুড়ে তার শিল্পীজীবন শুধু সংগীতাঙ্গনকেই সমৃদ্ধ করেনি, বরং লালনের দর্শন ও বাংলার লোকসংস্কৃতিকে পৌঁছে দিয়েছে দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে।

তার মৃত্যুতে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে গভীর শোক নেমে এসেছে। সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এক শোকবার্তায় বলেছেন, ফরিদা পারভীনের প্রয়াণে বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গন এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হলো। তিনি শুধু গানই করেননি, বরং আমাদের সংস্কৃতির দর্শন ও মানবিক বোধকে গানের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। তার কণ্ঠে লালনের গান শোনার সময় মনে হতো এটি কেবল সুরের আবেগ নয়, বরং আমাদের জীবনের গভীর দর্শনের প্রতিফলন। তিনি আরও বলেন, ফরিদা পারভীনের শিল্পচর্চা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে প্রেরণা জুগিয়েছে এবং তার অবদান জাতির স্মৃতিতে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।

১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরের সিংড়া থানায় জন্মগ্রহণ করেন ফরিদা পারভীন। তার শৈশব কেটেছে বাবার চাকরির কারণে দেশের নানা স্থানে। তবে সংগীতের প্রতি তার ঝোঁক খুব অল্প বয়স থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে, ১৯৬৮ সালে, তিনি পেশাদার সংগীতজীবনে প্রবেশ করেন। প্রথমদিকে নজরুলগীতি ও আধুনিক গান গাইলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি মনোনিবেশ করেন লালনগীতিতে, যা তার শিল্পীজীবনের মূল পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়।

কুষ্টিয়ার পরিবেশ তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেখানেই তিনি প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি লালনের গান ও ভাবধারার গভীরে প্রবেশ করেন। এসএসসি শেষ করেন কুষ্টিয়ার মীর মশাররফ হোসেন বালিকা বিদ্যালয় থেকে এবং পরে কুষ্টিয়া গার্লস কলেজ থেকে এইচএসসি ও স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের সঙ্গে সমান্তরালে তিনি গানকে করে নেন জীবনের প্রধান সাধনা।

দীর্ঘ ৫৫ বছরের সংগীতজীবনে ফরিদা পারভীন গেয়েছেন অসংখ্য কালজয়ী গান। “খাঁচার ভেতর অচিন পাখি”, “আমি কোথায় পাবো তারে”, “মিলন হবে কত দিনে”, “ভালোবাসার আরেক নাম দুঃখ” কিংবা “সোনার মায়না পাখি”র মতো গান তার কণ্ঠে পেয়েছে নতুন মাত্রা। শ্রোতাদের কাছে তার গানের আবেদন কখনো ফিকে হয়নি। দেশের মঞ্চ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গন—সবখানেই তিনি বাংলার গানকে উপস্থাপন করেছেন গর্বভরে। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার নানা দেশে লালনগীতি পরিবেশন করে তিনি বাঙালি সংস্কৃতিকে পরিচিত করেছেন বিশ্বমঞ্চে।

তার শিল্পীসত্ত্বার স্বীকৃতি এসেছে নানা পুরস্কার ও সম্মাননায়। একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক ছাড়াও তিনি পেয়েছেন অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা। তবে তার কাছে সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি ছিল মানুষের ভালোবাসা। তার গান শুনে অগণিত মানুষ যে আবেগে ভেসেছে, তাতেই তিনি খুঁজে নিয়েছিলেন জীবনের সার্থকতা।

ফরিদা পারভীনের মৃত্যুতে শুধু তার পরিবার বা সহকর্মীরাই শোকাহত নন, বরং সমগ্র জাতি হারিয়েছে এক সাংস্কৃতিক বাতিঘর। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে গেছে ভক্ত, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের শোকবার্তায়। অনেকে লিখেছেন, তিনি ছিলেন এমন এক শিল্পী যিনি গানকে করে তুলেছিলেন জীবনের সত্য অনুসন্ধানের পথ।

বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের প্রবীণ শিল্পীরা জানিয়েছেন, লালন সঙ্গীতকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে ফরিদা পারভীনের অবদান অবিস্মরণীয়। শুধু গান গাওয়া নয়, তিনি গানকে ব্যাখ্যা করেছেন নিজের জীবনচর্চায়। তার কণ্ঠে লালনের দার্শনিক বক্তব্যগুলো সহজভাবে পৌঁছে গেছে সাধারণ মানুষের কাছে।

প্রবীণ সংগীতজ্ঞরা বলছেন, ফরিদা পারভীনের মতো শিল্পী এক যুগে একবারই জন্ম নেন। তিনি যে ঐতিহ্য গড়ে দিয়েছেন, তা উত্তরসূরিদের জন্য এক বিশাল দায়িত্ব রেখে গেলেন। তার গাওয়া গান ভবিষ্যতেও নতুন প্রজন্মকে পথ দেখাবে, অনুপ্রাণিত করবে।

রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। সবাই স্বীকার করেছেন, ফরিদা পারভীন ছিলেন শুধু একজন কণ্ঠশিল্পী নন, তিনি ছিলেন বাঙালির সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক, যিনি আমাদের গান ও দর্শনকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছেন।

তার মৃত্যুতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তবে তার গাওয়া গান, তার দর্শন, এবং তার জীবনব্যাপী সাধনা বাঙালি সংস্কৃতির ভাণ্ডারে অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তিনি থাকবেন অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে।

সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ভাষায়, “ফরিদা পারভীন আমাদের সংগীতের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন। তার প্রস্থান আমাদের সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু তার গান, তার দর্শন এবং তার জীবনভিত্তিক সাধনা আমাদের পথ দেখিয়ে যাবে।”

এভাবেই কিংবদন্তি শিল্পী ফরিদা পারভীনের জীবনযাত্রা শেষ হলেও তার শিল্পীসত্ত্বা অমর হয়ে থাকবে কোটি মানুষের হৃদয়ে। তার মৃত্যুতে জাতি হারাল এক মহান শিল্পীকে, তবে তার সৃষ্টিই তাকে বাঁচিয়ে রাখবে যুগ যুগ ধরে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত