প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গন আজ শোকের সাগরে নিমজ্জিত। লালনগীতির জীবন্ত কিংবদন্তি ফরিদা পারভীন আর নেই। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তাঁর গানে যে আবেগ, যে গভীরতা ও যে আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া পেয়েছে, তা আজ চিরতরে থেমে গেছে। অথচ তাঁর রেখে যাওয়া অমূল্য সৃষ্টি চিরকাল বেঁচে থাকবে, অনুরণিত হবে মানুষের হৃদয়ে। ফরিদা পারভীন ছিলেন শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি ছিলেন লালনচর্চার প্রাণকেন্দ্র। জীবনের প্রায় সাত দশক তিনি গানকে, বিশেষ করে সাঁইজি লালনের দর্শনকে, আপন করে নিয়েছিলেন। তাঁর কণ্ঠে লালনের গান মানেই এক বিশেষ অনুভূতি, এক অনন্য আবহ, যা শ্রোতাকে যেন অন্য এক জগতে পৌঁছে দিত।
ফরিদা পারভীনের জন্ম কুষ্টিয়ায়, সেই মাটিতে যার সঙ্গে লালন ফকিরের নাম জড়িয়ে আছে অঙ্গাঙ্গিভাবে। ছোটবেলা থেকেই গান শেখা এবং লালনের দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তাঁর সুরেলা কণ্ঠ এবং গান পরিবেশনের অনন্য ভঙ্গি তাঁকে আলাদা মর্যাদা এনে দেয়। কুষ্টিয়ার মানুষ তাঁকে নিজেদের গর্ব মনে করে আজীবন সম্মান দিয়েছে। তিনি ছিলেন কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক, যিনি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশকে পরিচিত করেছেন।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। ষাট ও সত্তরের দশকে যখন লালনসংগীতের আধুনিক প্রচার-প্রসার তেমনভাবে হয়নি, তখন ফরিদা পারভীনই ছিলেন অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ। তাঁর কণ্ঠে লালনের দর্শন পৌঁছেছে গ্রাম থেকে শহরে, শহর থেকে বিদেশে। লালনের দর্শন, মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা তিনি তুলে ধরেছেন এমন এক শিল্পরূপে, যা অন্য কেউ করতে পারেননি।
তাঁর গান ছিল মানুষের অন্তরের কথা। “খাঁচার ভেতর অচিন পাখি”, “আমি কোথায় পাব তারে”, “তুমি রবে নীরবে”, কিংবা “ভ্রমর কইও গিয়া”— এসব গান তাঁর কণ্ঠে হয়ে উঠেছিল চিরন্তন। কেবল সুর বা কণ্ঠ নয়, তিনি গান পরিবেশনের সময় শ্রোতার সঙ্গে যে আধ্যাত্মিক যোগসূত্র স্থাপন করতেন, সেটিই তাঁকে অন্য সবার থেকে আলাদা করেছে। তাই তাঁকে বলা হয় লালনগীতির সম্রাজ্ঞী।
ফরিদা পারভীনকে নিয়ে কথা বলেছেন দেশের অসংখ্য শিল্পী। অনেকে তাঁকে “লালনকন্যা” বলেও অভিহিত করেছেন। জনপ্রিয় শিল্পী বিউটি এবং আরও অনেকে তাঁকে অনুসরণ করেছেন, তবে তাঁরা নিজেরাই স্বীকার করেছেন যে ফরিদা পারভীন একজনই। যেমন এক সাক্ষাৎকারে এক শিল্পী বলেন, “আমাদের লালনকন্যা বললেও আপনি মন খারাপ করবেন না। পৃথিবীতে ফরিদা পারভীন একজনই হন।” এই কথাটিই হয়তো আজকের দিনে সবচেয়ে বেশি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, যখন তিনি আমাদের মাঝে নেই।
ফরিদা পারভীন শুধুমাত্র একজন গায়িকা ছিলেন না; তিনি ছিলেন শিক্ষক, পথপ্রদর্শক এবং সাংস্কৃতিক যোদ্ধা। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে লালনের গান ছড়িয়ে দিতে তাঁর অবদান অপরিসীম। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মশালা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক আসরে তিনি লালনগীতির মূলে থাকা দর্শনকে তুলে ধরেছেন। বিদেশের মঞ্চেও তিনি লালনের গান পরিবেশন করেছেন এবং বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছেন, বাংলার মাটিতে জন্ম নেওয়া এই গানগুলো কতটা গভীর ও সর্বজনীন।
তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় ছিল সংগীতকে নিবেদন করার ইতিহাস। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সরল, বিনয়ী এবং ভদ্র। খ্যাতি বা পুরস্কারের মোহ তাঁকে কখনো প্রভাবিত করতে পারেনি। যদিও তিনি পেয়েছেন একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, যার মধ্যে রয়েছে একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারের মতো রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। কিন্তু তাঁর কাছে সবকিছুর ওপরে ছিল গান, ছিল লালনের দর্শনকে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া।
আজকের প্রেক্ষাপটে ফরিদা পারভীনের চলে যাওয়া কেবল একজন শিল্পীর মৃত্যু নয়, বরং একটি যুগের অবসান। বাংলাদেশে লালনসংগীতের যে ধারা তিনি তৈরি করে গেছেন, তা চিরকাল অম্লান থাকবে। তবে একইসঙ্গে এটিও সত্য যে, তাঁর মতো আর কেউ হয়তো আসবে না। তাঁর কণ্ঠ, তাঁর পরিবেশনা এবং তাঁর নিবেদন চিরকালই অনন্য হয়ে থাকবে।
তাঁকে হারানোর ব্যথা আজ দেশজুড়ে অনুভূত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করছেন হাজারো মানুষ। অনেকে স্মৃতিচারণ করছেন, কেউ বলছেন তাঁর গান জীবনের প্রেরণা ছিল, কেউ আবার লিখছেন, “তাঁকে ছাড়া লালনগান কল্পনাই করা যায় না।”
যে শিল্পী প্রায় সাত দশক ধরে গান গেয়ে এসেছেন, যিনি দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বকে লালনের দর্শন পৌঁছে দিয়েছেন, তাঁর অভাব পূরণ করা সম্ভব নয়। অনেকেই বলছেন, তিনি না থাকলেও তাঁর গান যতদিন থাকবে, ততদিন তিনি মানুষের মনে অমর থাকবেন। সত্যিই তাই, শিল্পী চলে যান, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি থেকে যায় যুগের পর যুগ। ফরিদা পারভীনের গানও থাকবে তেমনই অমর।
আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর গান, তাঁর দর্শন, তাঁর কণ্ঠে লালনের ব্যাখ্যা বেঁচে থাকবে আরও শতাব্দী। তাঁর গান শোনার অভিজ্ঞতা আর কখনো সরাসরি পাওয়া যাবে না, কিন্তু যে সুরগুলো তিনি রেখে গেছেন, তা মানুষের অন্তর জুড়িয়ে যাবে চিরকাল। পৃথিবীতে ফরিদা পারভীন একজনই হন, আর তাঁর সেই অনন্য উপস্থিতি এখন থেকে আমাদের স্মৃতির পাতায় অমলিন হয়ে থাকবে।