প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
পদ্মা সেতুতে সোমবার (১৫ সেপ্টেম্বর) থেকে লাইভ পাইলটিং আকারে চালু হচ্ছে আধুনিক ননস্টপ ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) সিস্টেম। এই নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে সেতু পার হওয়া গাড়িগুলোকে থামানো ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল পরিশোধের সুযোগ মিলবে। গাড়ি চালকরা নির্ধারিত লেন ব্যবহার করে পদ্মা সেতু পার হলে তাদের রেজিস্টার্ড অ্যাকাউন্ট থেকে নির্ধারিত টোল পরিমাণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে নেওয়া হবে, যা বাংলাদেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রোববার (১৪ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের বিশেষ নির্দেশনায় এই ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন কার্যক্রম চালু হচ্ছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, নতুন এই সিস্টেমের মাধ্যমে টোল প্লাজার সামনে গাড়ি থামানোর প্রয়োজন হবে না, ফলে যানজট কমবে এবং সময় সাশ্রয় হবে। এছাড়া, এটি ত্রুটিমুক্ত লেন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সেতুর নিরাপত্তা ও পরিচালনাকে আরও উন্নত করবে।
ইটিসি সিস্টেম ব্যবহারের জন্য প্রথম ধাপ হলো ব্যবহারকারীর গাড়ি রেজিস্ট্রেশন। এ জন্য ব্যবহারকারীদের ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের TAP অ্যাপ-এ গিয়ে ‘D-Toll’ অপশন নির্বাচন করতে হবে। এই ধাপে গাড়ি সংক্রান্ত তথ্য যেমন রেজিস্ট্রেশন নম্বর, গাড়ির ধরন এবং ব্যবহারকারীর মোবাইল নম্বর বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংযোগের মতো বিষয়গুলো আপলোড করতে হবে। রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হওয়ার পর ব্যবহারকারীকে নির্ধারিত পরিমাণ টোলের জন্য অ্যাকাউন্টে ব্যালেন্স রিচার্জ করতে হবে।
প্রথমবারের মতো সেতুর ইটিসি লেন ব্যবহার করতে হলে, গাড়ি রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করার পর ব্যবহারকারীকে সেতুর RFID বুথে গিয়ে ট্যাগ চেক ও রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম শেষ করতে হবে। এই প্রক্রিয়া শেষে গাড়ি ব্যবহারকারীরা ন্যূনতম ৩০ কিলোমিটার/ঘণ্টা গতিতে ইটিসি লেন ব্যবহার করতে পারবেন। এ সময় গাড়ির টোলের টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট থেকে কেটে নেওয়া হবে।
পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এই ইলেকট্রনিক টোল সিস্টেম প্রবর্তনের মাধ্যমে শুধু সময় বাঁচবে না, বরং টোল কালেকশন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, নিরাপদ ও কার্যকর হবে। এটি পরিস্কারভাবে টোল আদায় সংক্রান্ত ত্রুটি ও অনিয়মের সুযোগকে দূর করবে। এছাড়া, সেতুর বিভিন্ন লেনের বেনিফিট অনুযায়ী গাড়িগুলোর প্রবাহও সহজ হবে, যা যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে।
ভবিষ্যতে এই সেবাকে আরও বিস্তৃত করা হবে। TAP অ্যাপের পাশাপাশি অন্যান্য ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাপও ইটিসি সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের a2i (এটুআই) বিশেষ কাজ করছে। ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে সহজে রেজিস্ট্রেশন ও রিচার্জ করতে পারবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন সিস্টেমের প্রবর্তন বাংলাদেশের সেতু ব্যবস্থাপনায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি শুধু পদ্মা সেতুতে নয়, ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য বড় সেতু ও হাইওয়েতেও প্রযোজ্য হতে পারে। যেমন, কেবলমাত্র সময় সাশ্রয় নয়, গাড়ি থামানো ছাড়া টোল আদায়ের মাধ্যমে জ্বালানি খরচও কমবে, যা পরিবেশের জন্যও সহায়ক হবে।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন চালু হওয়ার পর প্রথম দিকে কিছু ব্যবহারকারীকে সহায়তা প্রদানের জন্য বিশেষ কাউন্টারের ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া, সেতু পারাপারের সময় প্রয়োজনে ব্যবহারকারীরা সহায়ক স্টাফের সহায়তা নিতে পারবে। সরকারের লক্ষ্য, ধাপে ধাপে ইটিসি সিস্টেমকে পুরোপুরি লাইভ করা, যাতে দেশব্যাপী টোল কালেকশন সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় হয়।
সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইলেকট্রনিক টোলের মাধ্যমে সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনায় আরও দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া, ব্যবহারকারীদের তথ্য এবং ট্রানজেকশন রেকর্ড থাকায় কোনো বিতর্ক বা টোল সংক্রান্ত অসুবিধা সহজেই সমাধান করা সম্ভব হবে। এই সিস্টেমের মাধ্যমে টোল আদায় স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য হবে, যা দেশের জনসাধারণের আস্থা বৃদ্ধি করবে।
ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের TAP অ্যাপের মাধ্যমে গাড়ি রেজিস্ট্রেশন ও রিচার্জের সুবিধা পাওয়া যাবে সহজে। ব্যবহারকারীরা তাদের মোবাইল ফোন থেকে ২৪ ঘণ্টা যেকোনো সময়ে অ্যাকাউন্টে ব্যালেন্স রিচার্জ করতে পারবেন। এছাড়া, এই অ্যাপের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা তাদের টোল খরচ, লেন ব্যবহার এবং পেমেন্টের বিস্তারিত হিসাবও জানতে পারবেন।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়নের অংশ নয়, এটি সেতু ব্যবস্থাপনায় যুগান্তকারী পরিবর্তন। এটি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সরাসরি যুক্ত, কারণ পদ্মা সেতু বাণিজ্যিক এবং যাতায়াতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংযোগ সেতু। ইটিসি সিস্টেম চালু হলে গাড়ি চলাচলে সময় ও খরচের সাশ্রয় হবে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী হবে।
এছাড়া, এই সিস্টেমের মাধ্যমে যানজট কমানো সম্ভব হবে, যা পরিবেশগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। গাড়ি থামানো ও শুরু করার সময় জ্বালানি খরচ এবং বায়ু দূষণ কমবে। তাই ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন শুধু অর্থনৈতিক সুবিধা নয়, পরিবেশ সংরক্ষণেও সহায়ক হবে।
পরিশেষে বলা যায়, পদ্মা সেতুতে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন চালু হওয়া দেশের সেতু ব্যবস্থায় এক নতুন যুগের সূচনা। TAP অ্যাপের মাধ্যমে সহজ রেজিস্ট্রেশন ও রিচার্জের সুবিধা, RFID বুথের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় টোল আদায়, এবং ভবিষ্যতে অন্যান্য ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাপের সংযোগ—all মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও যুগোপযোগী করবে। এই পদক্ষেপের ফলে গাড়ি চালক, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ জনগণও উপকৃত হবেন, সেতুর কার্যক্রম আরও দক্ষ ও নিরাপদ হবে, এবং দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তি ব্যবস্থাকে নতুন মাত্রা যোগ করবে।