প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এ আজ মঙ্গলবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ তিনজনের বিরুদ্ধে চলমান মামলায় দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের অবশিষ্ট সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল সকাল থেকে এ সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করবেন বলে ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে। এর আগে সোমবার সকাল ১১টা ২০ মিনিট থেকে বিকেল পর্যন্ত তার সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া চলে। তবে দীর্ঘ সময় জেরা ও নানা প্রশ্নোত্তরের কারণে তা শেষ করা সম্ভব হয়নি। ফলে ট্রাইব্যুনাল অবশিষ্ট সাক্ষ্য এবং জেরা গ্রহণের জন্য আজকের তারিখ নির্ধারণ করেন।
মাহমুদুর রহমানের সাক্ষ্যের পরবর্তী পর্যায় শেষ হলে এ মামলায় সাক্ষ্য দেবেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এর মাধ্যমে মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্বে প্রবেশ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতোমধ্যে গত ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ মামলায় মোট ৪৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করেছে ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে ১৪তম দিনের শুনানিতে ছয়জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এছাড়া ৮ সেপ্টেম্বর তিনজন সাক্ষ্য দেন।
গত ২ সেপ্টেম্বর গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য প্রদান করেন সাবেক পুলিশ প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। তিনি নিজেই মামলার আসামি থেকে রাজসাক্ষীতে পরিণত হয়েছেন। তার জেরা শেষ হয় ৪ সেপ্টেম্বর। ওই সাক্ষ্যে তিনি জানান, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের প্রত্যক্ষ নির্দেশে গত বছরের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত আন্দোলনের সময় গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। তিনি আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং এর সঙ্গে জড়িত নানা অজানা তথ্য প্রকাশ করেন। তার এই জবানবন্দি মামলার গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
সাক্ষ্যগ্রহণের ধারাবাহিকতায় দেখা গেছে, বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসক, সাংবাদিক, প্রত্যক্ষদর্শী এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরা আদালতে উপস্থিত হয়ে ভয়াবহ বর্ণনা তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে গত বছরের জুলাই-আগস্টের ঘটনাগুলোতে দেশজুড়ে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে বলে সাক্ষীরা উল্লেখ করেছেন। শহীদ পরিবারের সদস্যরা আদালতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানিয়েছেন, প্রিয়জনদের হারানোর বেদনা এখনও তারা ভুলতে পারছেন না। তারা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
উল্লেখ্য, গত ১০ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। প্রসিকিউশন তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি পৃথক অভিযোগ এনেছে। আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রটি মোট আট হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার। এর মধ্যে তথ্যসূত্র সংক্রান্ত অংশ দুই হাজার ১৮ পৃষ্ঠা, জব্দ তালিকা ও দালিলিক প্রমাণাদি চার হাজার পাঁচ পৃষ্ঠা এবং শহীদদের তালিকার বিবরণ দুই হাজার ৭২৪ পৃষ্ঠায় বিস্তৃত। মামলার সাক্ষী হিসেবে তালিকাভুক্ত আছেন মোট ৮১ জন। গত ১২ মে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা চিফ প্রসিকিউটরের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়, যা পরবর্তীতে আদালতে গৃহীত হয়।
এই মামলাকে ঘিরে দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় বইছে। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত এ নিয়ে মতামত প্রকাশ করছেন। বিরোধী শিবির বলছে, দীর্ঘদিন ধরে যারা ক্ষমতার অপব্যবহার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী, তাদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে শাসক দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, এই মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে আদালতের ভেতর ও বাইরে আইনজীবীরা মনে করছেন, এত দীর্ঘ জবানবন্দি ও বিপুল প্রমাণপত্র উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বিচার প্রক্রিয়া সামনে এগিয়ে চলেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এ মামলার দিকে গভীর নজর রাখছে। তারা বলছে, বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা গেলে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্তমূলক মামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। আন্তর্জাতিক মহলেও এর প্রভাব পড়তে পারে। জাতিসংঘের কিছু বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেছেন, যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর মামলাগুলোতে সাক্ষ্যগ্রহণের ধারাবাহিকতা এবং অভিযোগের গুরুত্ব একটি রাষ্ট্রের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী ভূমিকা রাখে।
মাহমুদুর রহমানের সাক্ষ্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে কারণ তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন দিক প্রত্যক্ষ করেছেন। তার সাক্ষ্য থেকে মামলার মূল ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত নতুন কিছু তথ্য উঠে আসতে পারে বলে আইন বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। তার বক্তব্য কেবল একজন সম্পাদক হিসেবে নয়, বরং একজন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তির বিবেচনায় মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম নিয়ে জনগণের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। আদালতের বাইরে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ভিড় জমাচ্ছেন। অনেকেই বলেছেন, তারা ন্যায়বিচারের একটি সুনির্দিষ্ট উদাহরণ দেখতে চান। শহীদ পরিবারের সদস্যরা বিশেষ করে জানিয়েছেন, এ রায় যদি দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে দেওয়া হয় তবে দেশের মানুষের মনে ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা আরও দৃঢ় হবে।
সবশেষে বলা যায়, আজকের সাক্ষ্যগ্রহণ মামলার অগ্রগতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করবে। মাহমুদুর রহমানের অবশিষ্ট সাক্ষ্য থেকে নতুন তথ্য উঠে এলে তা মামলার ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমে কীভাবে এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়, সেটিই এখন সবার নজরে। এই বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শুধু কয়েকজন অভিযুক্তের ভাগ্যই নির্ধারিত হবে না, বরং বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থার একটি বড় পরীক্ষা হয়ে উঠবে এটি।