প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশে তিস্তা মহাপরিকল্পনা যাচাইয়ের জন্য চীনের একটি বিশেষজ্ঞ দল শীঘ্রই আসতে যাচ্ছে। এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর) তিনি ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি পোস্টে এই খবরে বিস্তারিত তথ্য দেন।
আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া লিখেছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তিস্তা প্রকল্পের সরেজমিন যাচাইয়ের জন্য চীনের একটি কারিগরি বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশে আসবে। এই দল প্রকল্পের প্রাথমিক নকশা, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং তিস্তা নদীর জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সকল কারিগরি ও বাস্তবভিত্তিক তথ্য পর্যালোচনা করবে।
উল্লেখযোগ্য যে, চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন গত সোমবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামের সঙ্গে বৈঠকে এই বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিলেন। রাষ্ট্রদূত জানান, তিস্তা প্রকল্পের কার্যক্রম এবং যাচাই প্রক্রিয়ায় তারা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছেন। এ সংক্রান্ত যাবতীয় সমন্বয় ও পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।
তিস্তা প্রকল্প বাংলাদেশের জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে নদীর জলসম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং জলবিধি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বন্যা ও খরার ঝুঁকি কমানো হচ্ছে। তবে প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা এবং প্রযুক্তিগত বাস্তবায়ন যাচাই করার জন্য আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দলকে আমন্ত্রণ করা হয়েছে।
প্রকল্পটি বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে, তবে প্রকল্পের কার্যকারিতা এবং জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সর্বাধুনিক কারিগরি পর্যালোচনা প্রয়োজন। চীনের বিশেষজ্ঞ দল মূলত হাইড্রোলজি, জলবিজ্ঞান, বাঁধ নির্মাণ ও নদী নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি সংক্রান্ত বিষয়ে প্রকল্পের প্রতিটি দিক যাচাই করবে। তাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রকল্পের নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব এবং ভবিষ্যত উন্নয়ন পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে।
তিস্তা নদী বাংলাদেশ এবং ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন, পানি সরবরাহ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। নদীর জলসম্পদ যথাযথভাবে ব্যবহার করতে না পারলে পানি সংকট, বন্যা ও অনাবৃষ্টি সমস্যা জটিল হয়ে যেতে পারে। সুতরাং তিস্তা প্রকল্পের কার্যকারিতা এবং প্রযুক্তিগত মান যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
চীনের বিশেষজ্ঞ দল প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে মাঠ পরিদর্শন, ডেটা সংগ্রহ এবং প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ করবে। এদের কাজের মধ্যে থাকবে নদীর বর্তমান অবস্থা, বাঁধের স্থায়িত্ব, পানি বিতরণ প্রক্রিয়া এবং যান্ত্রিক সরঞ্জামের কার্যকারিতা মূল্যায়ন। বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, প্রকৌশলী এবং স্থানীয় প্রকল্প ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে।
তিস্তা প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও পানি সংরক্ষণ। প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের ধান চাষ, সবজি উৎপাদন এবং জলসেচ ব্যবস্থার উন্নতি হবে। চীনের বিশেষজ্ঞ দলের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রকল্পের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য সমস্যা সমাধানের জন্য সুপারিশ করা হবে।
এছাড়া, বিশেষজ্ঞ দল প্রকল্পের নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব যাচাই করার পাশাপাশি ঝুঁকি নিরূপণ করবে। নদী নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থ হলে বন্যা বা খরার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, যা সরাসরি স্থানীয় কৃষক ও জনসাধারণের জীবনমান প্রভাবিত করবে। বিশেষজ্ঞদের রিপোর্ট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সরকারের নীতি নির্ধারণ, বাজেট বরাদ্দ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।
চীনের বিশেষজ্ঞ দলের আগমন বাংলাদেশের জন্য কেবল প্রযুক্তিগত সহায়তা নয়, বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও জ্ঞানের বিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এটি বাংলাদেশের জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা খাতকে আরও আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে শক্তিশালী করবে। বিশেষজ্ঞ দলের প্রস্তাবিত সমাধান এবং সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে নদী ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য উন্নতি লক্ষ্য করা যাবে।
পররাষ্ট্রদপ্তর এবং অর্থ মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই চীনের বিশেষজ্ঞ দলের জন্য সমস্ত প্রয়োজনীয় সমন্বয় শুরু করেছে। ভিসা প্রক্রিয়া, যাতায়াত ব্যবস্থা এবং স্থানীয় অফিস সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ দলের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, তারা বাংলাদেশে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস অবস্থান করে প্রকল্পের বিস্তারিত যাচাই সম্পন্ন করবেন।
বিশেষজ্ঞ দলের আগমন স্থানীয় জনগণ, কৃষক এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে এক নতুন আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। প্রকল্পের মাধ্যমে নদীর জলবণ্টন এবং কৃষি উৎপাদনের সম্ভাব্য উন্নয়নের বিষয়ে নতুন তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে তারা বাস্তবসম্মত সমাধান প্রস্তাব করতে সক্ষম হবেন।
তিস্তা প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন শুধু নদীর পানি নিয়ন্ত্রণে নয়, বরং বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষজ্ঞ দলের যাচাইয়ের রিপোর্ট থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সরকারের নীতি নির্ধারণ আরও কার্যকর হবে।
পরিশেষে, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, চীনের বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্প যাচাই এবং উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এটি দেশের জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা, কৃষি উৎপাদন এবং পরিবেশগত স্থায়িত্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। বিশেষজ্ঞ দলের প্রাপ্ত তথ্য এবং সুপারিশ আগামী মাসে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় মূল ভূমিকা রাখবে।