রমজানের আগেই বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের আশ্বাস প্রধান উপদেষ্টার

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৩৮ বার
ভূমিকম্পের পর প্রধান উপদেষ্টার সর্তক বার্তা

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আশ্বস্ত করেছেন যে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে, পবিত্র রমজান শুরুর আগে দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি জানিয়েছেন, সরকার বিশ্বাসযোগ্য, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো হবে।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ওয়াশিংটন ডিসি থেকে ভিডিও কলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার সঙ্গে আলোচনার সময় তিনি এ কথা জানান। আলোচনায় বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাজস্ব বৃদ্ধির উদ্যোগ এবং আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে সরকারের পরিকল্পনা বিশেষভাবে উঠে আসে। বাসস এ সংলাপের বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

ড. ইউনূস বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মূল লক্ষ্য হলো দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। তিনি স্পষ্ট করে জানান, নির্বাচন শেষে তিনি তার পূর্ববর্তী কাজে ফিরে যাবেন। অর্থাৎ তার নেতৃত্বে পরিচালিত এই সরকার কেবল একটি সেতুবন্ধন তৈরির দায়িত্ব পালন করছে, যাতে দেশের জনগণ একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে।

আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা আলোচনায় ড. ইউনূসের নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “অধ্যাপক ইউনূস দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সংকটাপন্ন এক সময় তিনি নেতৃত্ব গ্রহণ করে সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়েছে।”

ড. ইউনূস জানান, সরকার ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন, রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। তার ভাষায়, “আমরা একেবারে ভেঙে পড়া অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। কেউ কেউ আক্ষরিক অর্থে ব্যাগভর্তি টাকা নিয়ে ব্যাংক থেকে পালিয়েছে। এই অবস্থার মধ্যে থেকে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানো একটি কঠিন কাজ হলেও আমরা কিছুটা সাফল্য অর্জন করেছি।”

অর্থনীতির প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে জর্জিয়েভা বলেন, “বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত সংকটময় মুহূর্ত অতিক্রম করছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই আপনারা যে অগ্রগতি অর্জন করেছেন তা প্রশংসনীয়। সঠিক সময়ে সঠিক ব্যক্তি নেতৃত্ব দিয়েছেন, এ কারণেই বাংলাদেশ নতুন করে সম্ভাবনা খুঁজে পাচ্ছে।”

অধ্যাপক ইউনূস আলোচনায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ও উল্লেখ করেন। তিনি নেপালের চলমান যুব আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ সমাজ একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় প্রভাব ফেলবে। এছাড়া তিনি বাংলাদেশের আসিয়ানভুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথাও তুলে ধরেন। তার মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

আলোচনায় বাংলাদেশের বড় ধরনের অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোর কথাও উঠে আসে। বিশেষত ঢাকার নতুন বন্দর ও টার্মিনাল প্রকল্পের অগ্রগতির কথা ড. ইউনূস তুলে ধরেন, যা আগামীতে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এ সময় আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ এবং অর্থ সচিব খায়রুজ্জামান মজুমদার। তারা আইএমএফ প্রধানকে সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগ সম্পর্কে অবহিত করেন। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা আনয়ন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।

আইএমএফ প্রধানও বাংলাদেশের সংস্কারমূলক উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং বলেন, “বাংলাদেশের ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সাহসী সংস্কার অপরিহার্য। আপনারা যদি দৃঢ় অবস্থানে থাকতে চান, তাহলে ব্যাংকিং খাত ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে হবে।”

ড. ইউনূস বলেন, “আমরা জানি চ্যালেঞ্জ অনেক বড়, তবে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।” তিনি আরও যোগ করেন, দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার।

অর্থনৈতিক দিক ছাড়াও নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর বাংলাদেশের দিকে রয়েছে। বিশেষ করে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও দাতা দেশগুলো বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চায়। এই প্রেক্ষাপটে ড. ইউনূসের বক্তব্য দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রত্যাশায় রয়েছে। আমরা সেই প্রত্যাশা পূরণের জন্য নিরলস কাজ করছি।”

উল্লেখ্য, গত বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ড. ইউনূসের সঙ্গে জর্জিয়েভার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। সেই সাক্ষাৎ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথরেখা তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল বলে তারা দুজনই আলোচনায় স্মরণ করেন।

সব মিলিয়ে আলোচনার সারমর্ম দাঁড়ায় এই যে, আগামী ফেব্রুয়ারিতে রমজানের আগেই বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তা গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবে। নির্বাচন শেষে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা শেষ হবে এবং দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব পুনরায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত করা হবে।

এতে শুধু দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও স্থিতিশীলতা আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। কারণ বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপগুলো তাই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত