চাকসু নির্বাচনে আলোচনায় নেই জুলাই আন্দোলনের তিন সমন্বয়ক

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ১০১ বার
চাকসু নির্বাচনে আলোচনায় নেই জুলাই আন্দোলনের তিন সমন্বয়ক

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত যে তিন মুখের উপস্থিতি প্রত্যাশিত ছিল, তারা কেউই নেই ভোটের মাঠে। জুলাই আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামে সরব ভূমিকা রাখা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক রাসেল আহমেদ, খান তালাত মাহমুদ রাফি ও আল মাসনূন—এই তিন নেতাই এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না। অথচ ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নগরজুড়ে তাদের কার্যক্রম ও দাপট ছাত্ররাজনীতির অন্যতম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আজ ভোটের ময়দানে তাদের অনুপস্থিতি নিয়ে শিক্ষার্থী মহলে চলছে নানামুখী আলোচনা।

শিক্ষার্থীদের একাংশ বলছেন, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সমন্বয়হীনতা, কেন্দ্র থেকে সবুজ সংকেত না পাওয়া এবং কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে এ নেতাদের জনপ্রিয়তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে সমন্বয়করাও দাবি করছেন, এটি তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত; ইচ্ছাকৃতভাবেই তারা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে যে নেতৃত্ব দৃশ্যমান ছিল, তারা যদি এ নির্বাচনেও সক্রিয়ভাবে মাঠে থাকতেন, তবে চাকসু নির্বাচনের চিত্র ভিন্ন হতো।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সহ-সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ছাত্র যুব আন্দোলনের সংগঠক ঈশা দে সাংবাদিকদের বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর যারা সরব ছিলেন তাদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে সরকারের বা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ সত্য না মিথ্যা তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হবে। তবে এসব বিতর্কই অনেককে সরে দাঁড়াতে প্রভাবিত করেছে।

অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সহ-সমন্বয়ক ও বর্তমানে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস)-এর চবি শাখার সদস্য সচিব আল মাসনূন জানিয়েছেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন না এবং সংগঠন থেকেও কোনো প্যানেল দেওয়ার পরিকল্পনা নেই। একইসঙ্গে প্রধান সমন্বয়ক ও বাগছাসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক খান তালাত মাহমুদ রাফি জানিয়েছেন, তিনি কখনও সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না, বরং শিখতে চেয়েছেন। ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, রাফি জুলাই আন্দোলনে সাহসিকতার পরিচয় দিলেও পরে অপর কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক রাসেল আহমেদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। এমনকি তাদের অনুসারীরা পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন পর্যন্ত করেছে। এই অভ্যন্তরীণ বিভক্তি আন্দোলনের শক্তিকে ক্ষয় করেছে বলে মনে করেন অনেকে।

বাগছাসের আরেক নেতা আর এম রশিদ দিনার বলেন, চাকসু নির্বাচন যদি গত বছরের আগস্টের পরপরই অনুষ্ঠিত হতো, তবে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। সে সময় আন্দোলনের গতি ও সমর্থন তাদের পক্ষে ছিল। কিন্তু সময় গড়াতে গড়াতে সেই জনপ্রিয়তা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রসঙ্গত, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ভেতরকার সংকট নতুন নয়। ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট সংগঠনের পাঁচজন শীর্ষ সমন্বয়ক ও সহ-সমন্বয়ক পদত্যাগ করেছিলেন। তারা হলেন সমন্বয়ক সুমাইয়া শিকদার এবং সহ-সমন্বয়ক আল মাসনূন, ধ্রুব বড়ুয়া, ঈশা দে ও সাইদুজ্জামান রেদোয়ান। এ পদত্যাগকে অনেকেই আন্দোলনের ভেতরের বিভাজনের সূচনা হিসেবে দেখেন।

এদিকে চাকসু নির্বাচনে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এ.কে.এম. আরিফুল হক সিদ্দিকীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবার মোট ১১৬২ জন প্রার্থী মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় সংসদের ২৬টি পদের জন্য ফরম নিয়েছেন ৫২৮ জন এবং হল সংসদের ২০৬টি পদের জন্য ফরম সংগ্রহ করেছেন ৬৩৪ জন।

এবারের নির্বাচনে ইতোমধ্যে তিনটি প্যানেল ঘোষণা করা হয়েছে। ছাত্র ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট যৌথভাবে ঘোষণা করেছে ‘দ্রোহ পর্ষদ’। ছাত্র অধিকার পরিষদ ঘোষণা করেছে ‘চাকসু ফর র‍্যাপিড চেঞ্জ’। এছাড়া ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ঘোষণা করেছে ‘সচেতন শিক্ষার্থী সংসদ’। ছাত্রশিবির ও ছাত্রদল এখনো তাদের পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করেনি, তবে আজকের মধ্যে তারা অবস্থান স্পষ্ট করবে বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতে, জুলাই আন্দোলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছাত্ররাজনীতির নতুন এক অধ্যায় তৈরি করেছিল। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে নেতৃত্বের ভেতরের বিভাজন, দ্বন্দ্ব ও সমন্বয়ের অভাবে সেই শক্তি ক্ষীণ হয়ে গেছে। রাসেল, রাফি ও মাসনূনের মতো নেতারা নির্বাচনী লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোয় এ ধারা আরও দুর্বল হয়েছে। ফলে এবারের চাকসু নির্বাচনে নতুন প্যানেল ও নতুন নেতৃত্বের উত্থানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তবে শিক্ষার্থীদের একাংশ এখনও বিশ্বাস করেন, আন্দোলনের সময়কার তাদের ভূমিকা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। নির্বাচনী রাজনীতিতে তারা না থাকলেও আগামী দিনে নতুন করে ফিরে আসতে পারেন। ছাত্ররাজনীতিতে উত্থান-পতন অবশ্যম্ভাবী। অনেক সময় নির্বাচনের বাইরে থেকে রাজনৈতিক মূলধন সঞ্চয় করাও কৌশলের অংশ। তাই ভোটের মাঠে অনুপস্থিত থাকলেও আলোচনায় তারা আছেন এবং থাকবেন।

সব মিলিয়ে এবারের চাকসু নির্বাচন কেবল প্রার্থীর লড়াই নয়, বরং আন্দোলনের ধারাবাহিকতা, নেতৃত্বের স্থায়িত্ব এবং ছাত্রসমাজের প্রত্যাশার প্রতিফলন হয়ে উঠতে যাচ্ছে। রাসেল, রাফি ও মাসনূনের অনুপস্থিতি ভোটের চিত্র পাল্টে দিলেও এটি ছাত্ররাজনীতির অঙ্গনে নতুন ভারসাম্যের সূচনা করতে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত