প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের বিরোধ ও প্রশাসনিক জটিলতার পর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) আবারও বিমানবন্দর অভ্যন্তরের নিরাপত্তার দায়িত্বে ফিরছে। এর ফলে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করা বিমানবাহিনীর সদস্যরা তাদের কার্যকাল শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজ নিজ বাহিনীতে ফিরে যাবেন। এই সিদ্ধান্ত সরকারি উচ্চ পর্যায়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকের মাধ্যমে চূড়ান্ত হয়েছে।
সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যাতে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে নিরাপত্তার দায়িত্ব পুনরায় এপিবিএনের হাতে তুলে দেওয়া হবে। এই বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ সহকারী লুৎফে সিদ্দিকী সভাপতিত্ব করেন। উপস্থিত ছিলেন পুলিশের আইজিপি বাহারুল আলম, প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের সচিব এম সাইফুল্লাহ পান্না, বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসরীন জাহান, বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক, বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমোডর আসিফ ইকবালসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বৃন্দ।
এই দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা দায়িত্ব হস্তান্তরের পেছনে রয়েছে ২০২৪ সালের আগস্টে ঘটে যাওয়া ‘আনসার বিদ্রোহ’। সেই সময় রাতারাতি প্রায় হাজারখানেক আনসার সদস্য দায়িত্ব ছেড়ে চলে গেলে বিমানবন্দরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অস্থায়ীভাবে বিমানবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। একই সময়ে এপিবিএনকে টার্মিনালের ভেতরে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছিল। এরপর থেকে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিচালনায় বিভিন্ন জটিলতা এবং দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে।
সূত্র জানায়, এপিবিএন অভিযোগ তোলে যে, তাদের এয়ার সাইডে থাকা অফিস কক্ষ থেকে মালামাল সরিয়ে দেওয়া হয়েছে অ্যাভসেকের পক্ষ থেকে। এ নিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরিও দায়ের করা হয়েছে। অন্যদিকে যাত্রী হয়রানি এবং নিরাপত্তা কার্যক্রমের ভিডিও মিডিয়ায় সরবরাহের মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পালটাপাল্টি অভিযোগ উঠতে থাকে। সর্বশেষ বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমোডর আসিফ ইকবালের চিঠিতে এপিবিএন অধিনায়কের শিষ্টাচার ভঙ্গের অভিযোগ বিষয়টিকে আরও জটিল করে তোলে।
বৈঠকে উপস্থিত সরকারি কর্মকর্তারা একমত হয়েছেন যে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পেশাদারিত্ব এবং পারস্পরিক সম্মান অপরিহার্য। প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ সহকারী লুৎফে সিদ্দিকী বৈঠকে বলেন, “সরকারি সংস্থাগুলো একই লক্ষ্যে কাজ করছে। আমাদের কথায় এবং কাজে পেশাদারত্ব বজায় রাখতে হবে। সবাইকে একে অপরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে যাতে বিমানবন্দর কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে পারে।”
এ বৈঠকে মোট ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এপিবিএন এবং অ্যাভসেক উভয় সংস্থাই বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের একক নির্দেশনায় তাদের দায়িত্ব পালন করবে। একই সঙ্গে বিমানবন্দর পরিচালনার একক কমান্ড, রেগুলেশন এবং নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে বেবিচককে প্রধান অপারেটর হিসেবে কার্যক্রম চালাতে হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যত দ্রুত সম্ভব এপিবিএন টার্মিনাল ভবনের ভেতরে কার্যক্রম শুরু করবে। এছাড়াও আইজিপি ও বেবিচক চেয়ারম্যান অপারেশনাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিয়মিত সভা করবেন। বিমানবাহিনী তাদের দায়িত্ব শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে মাতৃ সংস্থায় ফিরে যাবে। সব বিমানবন্দরেই প্রতি সপ্তাহে নিরাপত্তা সংক্রান্ত সভা অনুষ্ঠিত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবে বেবিচককে অপারেটর ও রেগুলেটরের পৃথক ভূমিকা পুনর্গঠনের বিষয়ে সুপারিশ জানাতে পারবে বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়।
বিমানবন্দর নিরাপত্তা পুনঃহস্তান্তরের সিদ্ধান্তকে সুশৃঙ্খলভাবে কার্যকর করতে এপিবিএন ইতিমধ্যেই প্রস্তুতি শুরু করেছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এপিবিএনের অভ্যন্তরীণ কমান্ড ব্যবস্থা বিমানবন্দরের নিরাপত্তার জন্য আরও শক্তিশালী, দ্রুত ও কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করবে। ফলে যাত্রী, স্টাফ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা আরও উন্নত হবে।
বিমানবাহিনী, যা গত বছর অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিরাপত্তা দায়িত্বে মোতায়েন করা হয়েছিল, তাদের কাজের মধ্যে কিছু চ্যালেঞ্জ এবং প্রশাসনিক দ্বন্দ্বও লক্ষ্য করা গিয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দায়িত্বহস্তান্তর সংক্রান্ত পরিকল্পনা পুরোপুরি আইনানুগ এবং সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিমানবন্দর নিরাপত্তার দায়িত্ব পুনঃহস্তান্তরের ফলে পেশাদারিত্ব এবং স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে, যা আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর পরিচালনার জন্য অপরিহার্য।
যাত্রী এবং স্টাফদের মধ্যে ইতিমধ্যেই আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, বিমানবন্দর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কার্যক্রমে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটবে না। এপিবিএন তাদের দীর্ঘমেয়াদী অভিজ্ঞতা এবং প্রশিক্ষণকে কাজে লাগিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করবে। পাশাপাশি প্রশাসনিক সমন্বয় ও নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি কমানো হবে।
পরিশেষে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার এই পুনর্গঠন কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি পেশাদারিত্ব, কার্যকারিতা এবং পারস্পরিক সম্মানের প্রতিফলন। সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে যাত্রী সুরক্ষা, নিরাপদ বিমান চলাচল এবং বিমানবন্দর পরিচালনার মানকে আন্তর্জাতিক স্তরে আরও দৃঢ় করবে।