ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে ২১ কিমি ম্যারাথন জয় তৌসিফ মাহবুবের

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৪৮ বার
ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে ২১ কিমি ম্যারাথন জয় তৌসিফ মাহবুবের

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা তৌসিফ মাহবুব শুধু অভিনয়েই নয়, এবার নিজেকে তুলে ধরলেন শারীরিক ও মানসিক দৃঢ়তার অনন্য প্রতীক হিসেবে। কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে মারাত্মক ফুসফুসের জটিলতায় ভোগার পরও তিনি ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ হাফ ম্যারাথনে দৌড়ে সবার কাছে প্রমাণ করলেন ইচ্ছাশক্তি থাকলে অসম্ভবও জয় করা যায়। শুক্রবার ভোরে রাজধানীর হাতিরঝিলে অনুষ্ঠিত ‘হাফ ম্যারাথন ২০২৫’-এ অংশ নিয়ে তিনি মাত্র ২ ঘণ্টা ৪৭ মিনিটে দৌড় শেষ করেন।

এই দৌড় কেবল শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষা ছিল না, বরং এটি ছিল মানসিক দৃঢ়তার প্রতীকও। তৌসিফ স্বীকার করেছেন, তিনি নিজেও বিশ্বাস করতে পারেননি যে এমন একটি চ্যালেঞ্জিং ম্যারাথন শেষ করতে পারবেন। কোভিড আক্রান্ত হওয়ার পর তার ফুসফুসের ৩৫ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেসময় ১০০ মিটার হাঁটার পরই শ্বাসকষ্টে ভুগে তাকে দীর্ঘ সময় বিশ্রাম নিতে হতো। অথচ আজ সেই মানুষই একটানা ২১ কিলোমিটার দৌড়ে শেষ করলেন।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “২১ কিলোমিটার শেষ করতে পারব, এটা আমি কল্পনাও করিনি। অনেকেই মাঝপথে অসুস্থ হয়ে থেমে যাচ্ছিলেন, কেউ কেউ অ্যাম্বুল্যান্সে করে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। আমি জানতাম ঝুঁকি আছে, কিন্তু তারপরও থামিনি। কারণ, এই দৌড়টা শুধু শরীরের নয়, এটা ছিল মনেরও লড়াই।” তিনি আরও জানান, আয়োজক তানভীর আহমেদের নিরন্তর উৎসাহ তাকে সাহস জুগিয়েছে, যা তাকে থেমে যেতে দেয়নি।

তৌসিফের এই অর্জন নিছক ক্রীড়াজগতে নাম লেখানো নয়, বরং এটি ছিল ব্যক্তি তৌসিফের আত্মপ্রত্যয়ী ঘোষণা। তার ভাষ্যে, “এই অর্জনটা একান্তই আমার নিজের জন্য। এটা কোনো প্রতিযোগিতা বা কারো কাছে কিছু প্রমাণ করার ব্যাপার নয়। আমি অভিনয়ের বাইরে নিজের জন্য কিছু করতে চাই, এই দৌড় তারই একটা অংশ।”

অভিনয়ের ব্যস্ত জীবনের বাইরেও তৌসিফ সবসময় চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসেন। এর আগে তিনি ১০ কিলোমিটার ম্যারাথনে অংশ নিয়েছিলেন, এবার তার গন্তব্য হলো হাফ ম্যারাথন। তিনি জানালেন, তার ইচ্ছা আছে একদিন হয়তো পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট জয় করার। যদিও সেটা এখনই সম্ভব না, তবে ছোট ছোট সাফল্যের মাধ্যমে নিজের স্বপ্নকে গড়ে তুলতে চান তিনি। “প্রথমে ১০ কিমি, এবার ২১ কিমি। সামনে হয়তো আরও বড় কিছু করব। এটা আমার নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই।”

ম্যারাথনে অংশ নেওয়ার সময় তৌসিফের হাতে ফিলিস্তিনের পতাকা ছিল, যা সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ বিষয়ে তিনি জানান, “দৌড়ের মাঝপথে দেখি একজন ভাই ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে দৌড়াচ্ছেন। সেটা আমাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে। আমি তাকে অনুরোধ করি পতাকাটা দিতে, আর এরপর পুরো দৌড়টাই আমি সেই পতাকা হাতে শেষ করি। ফিলিস্তিনের সংগ্রামের বার্তাটুকু আমার হাত দিয়েও পৌঁছাক, এই ভাবনা থেকেই পতাকাটি বহন করেছি।”

তার এই পদক্ষেপ অনেকের কাছে এক ধরনের প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী ফিলিস্তিনের মানুষের সংগ্রাম ও দুঃখের সময়ে একজন জনপ্রিয় শিল্পীর এই উদ্যোগ নিছক ক্রীড়াসফলতা ছাড়িয়ে গেছে বৃহত্তর মানবতার প্রতীক হিসেবে। সামাজিক মাধ্যমে তৌসিফের এই ছবি এবং ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই লিখেছেন, একজন অভিনেতার মাঠের বাইরে এভাবে মানবিক অবস্থান প্রকাশ করা সত্যিই প্রশংসনীয়।

অন্যদিকে চিকিৎসকরা বলছেন, কোভিড-পরবর্তী শারীরিক জটিলতা কাটিয়ে এমন দৌড় সম্পন্ন করা চিকিৎসাগত দিক থেকেও উল্লেখযোগ্য। কারণ, ফুসফুস আক্রান্ত হওয়ার পর স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস ফিরে পেতে অনেকেই দীর্ঘদিন সংগ্রাম করেন। সেখানে ২১ কিলোমিটার দৌড় শেষ করা মানে তৌসিফ তার শারীরিক সক্ষমতাকে নতুন এক স্তরে নিয়ে গেছেন।

শুক্রবার সকালে হাতিরঝিলের বাতাস, হাজারো অংশগ্রহণকারীর সমাগম এবং দৌড়ের মাঝে উদ্দীপনা—সবকিছু মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। সেখানে জনপ্রিয় এই অভিনেতাকে অনেকেই চিনতে পারেন এবং উৎসাহ দেন। দৌড় শেষে দর্শক ও সহ-দৌড়বিদদের করতালিতে অভিভূত হয়ে ওঠেন তিনি।

তৌসিফের এই অর্জন শুধু একজন অভিনেতার গল্প নয়, বরং এটি ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য এবং আত্মবিশ্বাসের গল্প। জীবনে অসুস্থতা কিংবা বিপর্যয়ের পর কীভাবে আবার দাঁড়াতে হয়, কিভাবে হার না মেনে সামনে এগিয়ে যেতে হয়, সেই শিক্ষা দিয়েছে তার এই ম্যারাথন। একই সঙ্গে, ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে তার এই দৌড় বিশ্ব মানবতার পক্ষেও এক শক্তিশালী বার্তা হয়ে উঠেছে।

সবশেষে, ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার কথা বলতে গিয়ে তৌসিফ জানান, তিনি নিজের জন্য নতুন নতুন লক্ষ্য স্থির করতে ভালোবাসেন। অভিনয়ের পাশাপাশি এমন সাফল্য তাকে ভেতরে ভেতরে আরও শক্তি জোগায়। তার ভাষায়, “এই ম্যারাথনটা ছিল আমার জন্য। আগামীতে আরও বড় চ্যালেঞ্জ নিতে চাই। হয়তো একদিন সত্যিই এভারেস্টেও উঠব।”

তৌসিফ মাহবুবের এই যাত্রা প্রমাণ করে দিয়েছে, জীবনের যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতেও দৃঢ় সংকল্প থাকলে জয় অনিবার্য। কোভিড-পরবর্তী দুর্বলতা থেকে আন্তর্জাতিক সংহতির বার্তা বহন—সবকিছুর মাঝে তিনি হয়ে উঠেছেন এক অনন্য অনুপ্রেরণা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত