প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
রাজধানী ঢাকায় ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন একই পরিবারের চারজন সদস্য। শুক্রবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে যাত্রাবাড়ীর ধলপুর বউবাজার লিচুবাগান মসজিদের পাশে একটি বহুতল ভবনের সপ্তম তলায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র বা এসি হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়ে মুহূর্তেই ঘরে আগুন ধরে যায় এবং এতে চারজন গুরুতরভাবে দগ্ধ হন। বর্তমানে তারা সবাই রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
দগ্ধরা হলেন মো. তুহিন হোসেন (৩৮), তার স্ত্রী ইবা আক্তার (৩০) এবং দুই শিশু সন্তান তাওহীদ (৭) ও তানভীর (৯)। পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে ওই বাসায় ভাড়া থাকছিলেন। তুহিন মোতালেব প্লাজার একটি মোবাইল সার্ভিসিং দোকানে কাজ করতেন এবং তাদের গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলায়।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনার রাতে সবাই ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ জোরে বিস্ফোরণের শব্দ হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘরের ভেতর আগুন ছড়িয়ে পড়ে। দগ্ধ ইবার বোন ফারজানা আক্তার জানিয়েছেন, এসি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় এবং মুহূর্তেই পরিবারের চারজনের শরীরে আগুন লেগে যায়। চিৎকার শুনে আশপাশের ভাড়াটিয়ারা ছুটে আসেন এবং প্রাণপণ চেষ্টা করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে স্থানীয়রা দগ্ধ চারজনকে দ্রুত বার্ন ইনস্টিটিউটে নিয়ে যান।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, চারজনের অবস্থাই গুরুতর। দগ্ধ ত্বকের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় তাদের সবারই নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে তাদের শরীরের ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ অংশ দগ্ধ হয়েছে। চিকিৎসা প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে এবং সবার জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এই দুর্ঘটনায় স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে শোক এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, ঘটনার পর পুরো ভবনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক ভাড়াটিয়া দ্রুত বাসা থেকে বের হয়ে আসেন। অনেকে আবার আতঙ্কে রাতভর ঘুমাতে পারেননি। এলাকাবাসীর দাবি, ভবনটির বিদ্যুৎ সংযোগ এবং যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রাথমিকভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান শুরু করে। সংস্থার প্রাথমিক ধারণা, এসির ভেতরে বিদ্যুৎ শর্ট সার্কিট বা গ্যাস জমে থাকার কারণে বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে। তবে বিস্তারিত তদন্ত ছাড়া সঠিক কারণ জানা সম্ভব নয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা ভবন মালিক ও ভাড়াটিয়াদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া এসি ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা বিপজ্জনক হতে পারে।
বাংলাদেশে এসি বিস্ফোরণের ঘটনা নতুন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসি যন্ত্রের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না করা, নিম্নমানের তার ও যন্ত্রাংশ ব্যবহার, বিদ্যুতের ভোল্টেজ ওঠানামা এবং যন্ত্রপাতি দীর্ঘ সময় চালু রাখা এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের মেরামতকাজ এবং অপরীক্ষিত যন্ত্রাংশ ব্যবহারও ভয়াবহ বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই ঘটনার পর নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, প্রতিটি পরিবারকে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে বাড়তি সতর্ক হতে হবে। এসি বা ফ্রিজের মতো ভারী বৈদ্যুতিক যন্ত্র নিয়মিত সার্ভিসিং না করালে সেগুলো বিস্ফোরণ বা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি দেশের বৈদ্যুতিক তার, ব্রেকার এবং সার্কিট সিস্টেমগুলো মানসম্মত না হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়।
দুর্ঘটনায় দগ্ধ পরিবারটির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ধরে নিবিড় চিকিৎসা প্রয়োজন হবে এবং চিকিৎসার খরচও হবে বিপুল পরিমাণে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। তুহিন হোসেন মোতালেব প্লাজার মোবাইল সার্ভিসিং দোকান থেকে যে আয়ে সংসার চালাতেন, তা দিয়ে এমন ব্যয়বহুল চিকিৎসা সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। ইতিমধ্যে এলাকাবাসী এবং আত্মীয়স্বজনরা মিলে চিকিৎসার জন্য কিছু অর্থ সংগ্রহ শুরু করেছেন।
এদিকে এই দুর্ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। অসংখ্য মানুষ আহত পরিবারের দ্রুত সুস্থতা কামনা করে পোস্ট দিচ্ছেন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরঞ্জামের নিরাপত্তা এবং রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, প্রতিনিয়ত এমন দুর্ঘটনা ঘটলেও কেন কর্তৃপক্ষ সচেতন হচ্ছে না এবং কেন সাধারণ মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগ বাড়ানো হচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদ এবং নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা শহরের অধিকাংশ বহুতল ভবনই অগ্নি-নিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ। এসি বিস্ফোরণ, গ্যাস লিকেজ বা বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধের জন্য যে নিয়মকানুন অনুসরণ করার কথা, তা প্রায়ই অবহেলিত থাকে। ভবন মালিকরা নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যথেষ্ট বিনিয়োগ করেন না এবং ভাড়াটিয়াদেরও এসব বিষয়ে সচেতন করা হয় না।
সব মিলিয়ে যাত্রাবাড়ীর এ দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহারে অসতর্কতা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব কতটা ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনতে পারে। এখন দগ্ধ চারজনের জীবনের জন্য লড়াই চলছে হাসপাতালে। পরিবারটি এবং আশপাশের মানুষ দোয়া করছেন তাদের সুস্থতার জন্য। তবে একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।