প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দেশের স্বর্ণ বাজারে আবারও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) নতুন করে স্বর্ণের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে, যা আজ রবিবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে কার্যকর হয়েছে। প্রতি ভরিতে ১ হাজার ১৫৫ টাকা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্বর্ণের দাম আবারও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। নতুন নির্ধারিত দামে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি ভরি এখন ১ লাখ ৮৯ হাজার ৩০৭ টাকা। ক্রেতা সাধারণের কাছে এই দাম নিঃসন্দেহে একটি বড় ধাক্কা, কারণ স্বর্ণ দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত মূল্যবান ধাতু।
শনিবার রাতে বাজুসের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে তেজাবি স্বর্ণ বা পিওর গোল্ডের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের বাজারেও দাম সমন্বয় করা হয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই স্বর্ণের দাম ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অর্থনীতির অস্থিরতা, মার্কিন ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দেশে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার কারণে স্বর্ণের দামে চাপ তৈরি হয়েছে।
নতুন মূল্যতালিকা অনুসারে, ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি ১ লাখ ৮৯ হাজার ৩০৭ টাকা, ২১ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি ১ লাখ ৮০ হাজার ৬৯৯ টাকা, ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি ১ লাখ ৫৪ হাজার ৮৮৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের ভরি ১ লাখ ২৮ হাজার ৪৭৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজুস জানিয়েছে, স্বর্ণের এই বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ন্যূনতম ৬ শতাংশ মজুরি যোগ হবে। গহনার নকশা ও মান অনুযায়ী মজুরির অঙ্কে ভিন্নতা থাকতে পারে, ফলে বাস্তবে ক্রেতাদের দিতে হবে আরও কিছুটা বাড়তি মূল্য।
বাংলাদেশে স্বর্ণের বাজার সবসময়ই বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে সম্পর্কিত। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই দেশের বাজারেও স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই দাম বৃদ্ধির ধারা প্রায় নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিগত এক দশক ধরে স্বর্ণ কেবল গহনার জন্য নয়, বিনিয়োগের জন্যও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের প্রতি মানুষের আস্থা ঐতিহাসিকভাবে দৃঢ়। বিশেষ করে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক মন্দা বা মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে গেলে মানুষ টাকার নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকেন।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের ক্রেতা ও সাধারণ মানুষের জন্য বিষয়টি নিঃসন্দেহে চাপের। কারণ একদিকে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম লাগামহীনভাবে বেড়ে চলেছে, অন্যদিকে স্বর্ণের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধির কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বিপাকে পড়ছে। অনেক পরিবারে বিয়ের মতো বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য স্বর্ণ ক্রয় অপরিহার্য। এ ধরনের সময় দামের অতিরিক্ত চাপ সাধারণ মানুষকে বিকল্প খোঁজার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনেকে হয়তো কম ক্যারেটের স্বর্ণ বা পুরোনো গহনা সংস্কারের পথ বেছে নিচ্ছেন।
স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা অবশ্য দাম বৃদ্ধিকে স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতির ফলাফল বলেই মনে করছেন। তাদের মতে, বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধি হলে দেশীয় বাজারে তা প্রভাব ফেলবেই। তবে ক্রেতারা অভিযোগ করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশে দাম বৃদ্ধির গতি অনেক বেশি। অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশীয় বাজারে তা প্রতিফলিত হতে সময় লাগে।
স্বর্ণ বাজারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে বর্তমানে ডলারের সংকট এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এই বাজারকে আরও অস্থির করে তুলছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার পাশাপাশি ডলার সংকটও দামের ঊর্ধ্বগতিকে ত্বরান্বিত করেছে। কারণ স্বর্ণ আমদানিতে ডলারের ওপর নির্ভরতা শতভাগ। ফলে ডলারের দাম বাড়লে বা সংকট তৈরি হলে স্বর্ণের দামও বেড়ে যায়।
একইসঙ্গে দেশের বাজারে স্বর্ণ চোরাচালানও একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। অনেক সময় অবৈধভাবে আমদানিকৃত স্বর্ণ বাজারে প্রবাহিত হয়, যা দামের স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করে। বাজুস বহুদিন ধরে চোরাচালান রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে বাস্তবে এই প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
বিশ্ববাজারে বর্তমানে আউন্সপ্রতি স্বর্ণের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ অবস্থানের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং এশিয়ার বাজারগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে স্বর্ণের প্রতি বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক বেড়েছে। বাংলাদেশও সেই বৈশ্বিক প্রবণতার বাইরে নয়।
বিয়ের মৌসুম সামনে রেখে দেশের বাজারে এই দামের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ ক্রেতাদের জন্য নতুন চাপ তৈরি করবে। অনেকেই হয়তো পরিকল্পিত স্বর্ণ কেনা থেকে সরে আসবেন বা বিকল্প হিসেবে কৃত্রিম অলংকার বেছে নেবেন। অন্যদিকে, যারা বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে স্বর্ণ কিনে থাকেন, তারা এই দাম বৃদ্ধিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। কারণ স্বর্ণ দীর্ঘমেয়াদে প্রায় সবসময়ই মুনাফা এনে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, দেশের বাজারে আবারও সোনার দাম বৃদ্ধি একটি বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, বৈশ্বিক বাজার এবং দেশীয় প্রেক্ষাপট মিলিয়ে আগামী দিনগুলোতেও এই বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ক্রেতারা যেখানে এই ঊর্ধ্বগতিতে হতাশ, ব্যবসায়ীরা সেখানে একে স্বাভাবিক নিয়মের অংশ বলেই ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। তবে সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি অন্য রকম—প্রয়োজনের তাগিদে সোনার বাজারে যেতেই হবে, আর সেখানে বাড়তি চাপ মেনে নিতে হবে চুপচাপ।