প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিআই) নির্বাচনের ঘনিষ্ঠ প্রেক্ষাপটে জেলা ব্যবসায়ী সমাজে রাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হওয়ার আগেই চেম্বার ভবনে তালা লাগানো, প্রশাসক নিয়োগ এবং মতবিনিময় সভার মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিক নেতারা একে অপরকে ষড়যন্ত্রকারী ও ফ্যাসিস্ট আখ্যা দিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছেন।
বগুড়া চেম্বারের নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচন প্রতি দুই বছরে অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। কিন্তু দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। সর্বশেষ নির্বাচন ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত হলেও তার পর থেকে চেম্বারের কার্যক্রম দীর্ঘ সময় ধরে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির মাধ্যমে চলেছে। দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদুর রহমান মিলন সম্প্রতি পদত্যাগ করলে জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি সাইরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
চেম্বারের নির্বাচন প্রক্রিয়া চালাতে চলতি বছরের ২১ জুন গঠিত হয় তিন সদস্যবিশিষ্ট নির্বাচন পরিচালনা কমিটি। কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন বগুড়া প্রেস ক্লাব সভাপতি রেজাউল হাসান রানু। তবে কমিটি গঠিত হবার পরপরই গত ২২ জুন ছাত্র-জনতা পরিচয়ে শতাধিক ব্যক্তি চেম্বার ভবনে প্রবেশ করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বের করে দিয়ে ভবন তালাবদ্ধ করে। ভবন তালাবদ্ধ থাকার ১৮ দিনের মাথায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মেজবাউল করিমকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। তাকে ১২০ কার্যদিবসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। একই সময়ে চেম্বারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদ রানা ভবন দখল ও নির্বাচনি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করেন।
এই ঘটনায় ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে উত্তেজনা ও জল্পনা সৃষ্টি হয়। গত ৩০ আগস্ট, বগুড়ার হোটেল মমইন কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয় ‘প্রকৃত ব্যবসায়ী কর্তৃক চেম্বার পরিচালনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা। সভার সভাপতিত্ব করেন রেজাউল হাসান রানু। উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা, কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য আলী আজগর তালুকদার হেনা, এবং জেলার বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
মতবিনিময় সভার পর শুরু হয়েছে নানা গুঞ্জন। আওয়ামী লীগপন্থি ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, বিএনপি ঘনিষ্ঠ একটি পক্ষ চেম্বারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে বিএনপি ঘনিষ্ঠরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগপন্থিরা চেম্বারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং এখন স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ পরিস্থিতি জেলা ব্যবসায়ী সমাজকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে।
চেম্বারের বর্তমানে ৭০০-এর বেশি সদস্য রয়েছে, যাদের মধ্যে দুটি স্পষ্টভাবে বিভক্ত গ্রুপ তৈরি হয়েছে। একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, নির্বাচনের আগেই কিছু পক্ষ রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা বলেন, “আমরা চাই নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচন, কোনো পক্ষ নির্দিষ্টভাবে সুবিধা পাবে না। নির্বাচনের মাধ্যমে চেম্বারের নেতৃত্ব পরিবর্তন হলে ব্যবসায়ীদের সঠিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে।”
প্রশাসক মেজবাউল করিম বলেন, “আমরা দ্রুত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করব। নির্বাচন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজন করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আশা করি, আগামী নভেম্বরে নির্বাচন সম্পন্ন হবে।” তিনি আরও জানান, নির্বাচনের মাধ্যমে ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে ভাঙন কাটিয়ে সুষ্ঠু নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
চেম্বার নির্বাচনের এই উত্তেজনা শুধুমাত্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিমণ্ডলেও দেখা দিয়েছে। নির্বাচনের আগে দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান এবং একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগের উত্তেজনা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও প্রভাব ফেলছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, “নির্বাচন না হওয়ার কারণে দীর্ঘদিন ধরে চেম্বারের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা কমে গেছে। এখন আমরা আশা করি, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে নিয়ে এসে কার্যকর নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে।”
চেম্বারের বর্তমান কমিটি ১৯ সদস্যের। এতে একজন করে সভাপতি, সিনিয়র সভাপতি, সহ-সভাপতি এবং ১৬ পরিচালক রয়েছেন। কমিটির দায়িত্ব নির্বাচনের পূর্বে চেম্বারের কার্যক্রম পরিচালনা ও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিশ্চিত করা। এই কমিটি নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করছে।
বেসরকারি ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচন অনুপস্থিত থাকায় চেম্বারে ক্ষমতার একচেটিয়া দখল তৈরি হয়েছে। ফলে নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং ক্ষমতা সংক্রান্ত উত্তেজনা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে। তাদের মতে, চেম্বারের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন না হলে ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে ভাঙন আরও গভীর হবে এবং রাজনৈতিক চাপের কারণে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও প্রভাব পড়বে।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “নির্বাচন শুধু চেম্বারের নেতৃত্ব পরিবর্তন নয়, এটি পুরো জেলার ব্যবসায়িক পরিবেশে স্বচ্ছতা এবং নতুন উদ্দীপনা নিয়ে আসবে। তাই নির্বাচন যত দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজন করা হবে, ততই সবার জন্য উপকারী হবে।” অন্যদিকে, আরেক ব্যবসায়ী বলেন, “নির্বাচনের আগেই বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে চরম প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। তবে প্রশাসনের সতর্ক তদারকি নির্বাচনকে সুষ্ঠু রাখতে সহায়ক হতে পারে।”
এই পরিস্থিতিতে প্রশাসক মেজবাউল করিম জানিয়েছেন, নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো পক্ষের সুবিধা দেওয়া হবে না। সকল প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, “আমরা চাই, চেম্বারের নির্বাচন হবে স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক। এতে সকল সদস্যের বিশ্বাস ও সমর্থন থাকবে। এ ছাড়া নির্বাচনের ফলাফল চেম্বারের কার্যক্রমকে আরও জোরদার করবে।”
বগুড়া চেম্বারের নির্বাচনের আগেই ব্যবসায়ী সমাজে তৈরি হওয়া এই উত্তেজনা ভবিষ্যতের নেতৃত্ব, নীতিনির্ধারণ এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলবে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের মধ্যে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, নির্বাচন শেষ হলে চেম্বারের কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে এবং দীর্ঘদিন ধরে চলমান দ্বন্দ্বের অবসান ঘটবে।
নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির উত্তেজনা শুধু রাজনৈতিক রঙ ধারণ করছে না, বরং এটি ব্যবসায়ী সমাজের সংহতি, স্বচ্ছতা এবং নেতৃত্ব নির্বাচনের গুরুত্বকেও সামনে তুলে ধরছে। এই নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হলে শুধু চেম্বারের কার্যক্রমই নয়, জেলার ব্যবসায়িক পরিবেশও ইতিবাচকভাবে প্রভা