প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
গাজা: ভোর থেকেই গাজায় ইসরাইলি বিমান হামলার ফলে অন্তত ৫১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে গাজা সিটিতে মারা গেছেন ৩৬ জন, আর রাফাহের একটি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে হামলায় নিহত হয়েছেন আরও আটজন। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
রাফাহ শহরের উত্তরে ত্রাণের খোঁজে আসা তিনজনকে ইসরাইলি বাহিনী গুলি করে হত্যা করেছে। হামলার ফলে আরও অনেকে আহত হয়েছেন। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা সিটিতে আটকে থাকা পরিবারগুলো ক্রমাগত হামলার শিকার হচ্ছে এবং প্রতিনিয়ত নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢাকা, এবং বিস্তীর্ণ এলাকায় ধোঁয়া ও ধ্বংসযজ্ঞের দৃশ্য চোখে পড়ছে।
ইসরাইলের স্থল আক্রমণ তীব্রতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাজা সিটির হাসপাতালগুলো ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় পৌঁছে গেছে। ক্রমাগত বোমাবর্ষণের মধ্যেও চিকিৎসকরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, তবে তাদের কার্যক্রম ক্রমশ জটিল ও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। হাসপাতালগুলোতে সরঞ্জাম এবং ঔষধের অভাব দেখা দিয়েছে, ফলে আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানও চ্যালেঞ্জের মুখে।
গাজায় চলমান সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা ইসরাইলকে হামলা বন্ধ করার এবং বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। শিশু, নারী এবং বৃদ্ধদের উপর হামলার খবর বিশ্ব সম্প্রদায়কে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় গাজায় কমপক্ষে ৬৫ হাজার ৩৮২ জন নিহত এবং এক লাখ ৬৬ হাজার ৯৮৫ জন আহত হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও হাজার হাজার মানুষ চাপা পড়ে থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই ধ্বংসযজ্ঞ যদি অব্যাহত থাকে, তবে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়বে।
বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেনেনের কাছে আনজা শহরে অভিযান চালানোর সময় ইসরাইলি বাহিনী ১৯ বছর বয়সী এক কিশোরকে গুলি করে হত্যা করেছে। এই ধরনের ঘটনা ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যুবকদের উপর সহিংসতার ধারাবাহিকতা নির্দেশ করছে।
গাজা অঞ্চলে স্থল ও বিমান হামলার পাশাপাশি নাগরিকদের ত্রাণ এবং চিকিৎসা সেবা পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। রাফাহ এবং গাজা শহরের ত্রাণ কেন্দ্রগুলোও হামলার শিকার হয়েছে, ফলে সাধারণ মানুষদের জন্য খাদ্য, পানি এবং ঔষধের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সাহায্যকারী সংস্থাগুলো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে, কিন্তু ক্রমাগত আক্রমণের কারণে কার্যক্রম সীমিত হচ্ছে।
হামলার তীব্রতা এবং স্থল অভিযান বৃদ্ধির কারণে গাজায় হাসপাতালগুলো কার্যত ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় পৌঁছে গেছে। চিকিৎসকরা অল্প সরঞ্জাম এবং ঔষধের মধ্যে আহতদের চিকিৎসা প্রদান করছেন। চিকিৎসা ব্যবস্থা ধ্বংসপ্রায় হওয়ায় আহতরা প্রাথমিক চিকিৎসা পেতে দেরি করছেন, যার ফলে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সতর্ক করেছে যে, গাজায় চলমান এই সহিংসতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে মানবিক সংকট আরও গুরুতর আকার নেবে। জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য মধ্যস্থতার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কার্যকর সমাধান দেখা যায়নি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গাজায় সহিংসতা শুধুমাত্র অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করছে না, বরং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলছে। শিশু ও নারীসহ সাধারণ জনগণের উপর হামলা এই সংঘাতকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকেও নিয়ে যাচ্ছে।
গাজার সাম্প্রতিক হামলা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে এবং বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন দেশ এবং মানবাধিকার সংস্থা তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য ও ত্রাণ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে গাজায় চিকিৎসা ও ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য জনশক্তি এবং সরঞ্জামের অভাব খুবই তীব্র। ক্রমাগত বোমাবর্ষণ এবং স্থল হামলার কারণে আহতদের জরুরি চিকিৎসা প্রদান করা দারুণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধ্বংসপ্রায় হাসপাতালগুলোও কার্যক্রম চালাতে পারছে না।
মানবাধিকার সংস্থা এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই হামলাকে “মানবিক আইনের শর্ত লঙ্ঘন” হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংস্থাটি ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করেছেন, গাজার সাম্প্রতিক সংঘাত অব্যাহত থাকলে মানবিক সংকট আরও গভীর হবে এবং বহু নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটবে।
ফিলিস্তিনি নাগরিকদের উপর এই সহিংসতার ধারাবাহিকতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ইসরাইলের কার্যক্রমের ওপর নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি যদি অব্যাহত থাকে, তবে শুধু গাজা নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাও বিপন্ন হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘ, এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ইতিমধ্যে এই হামলার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা গাজার জনগণের জন্য জরুরি ত্রাণ এবং চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছে।
গাজায় চলমান সহিংসতা এবং ধ্বংসযজ্ঞ শুধু ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের জন্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও মানবিক প্রেক্ষাপটেও ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সহিংসতা দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা ও শান্তি প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে।