প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ইউরোপের ইতিহাসে ২০২৪ সালের গ্রীষ্মকাল যেন এক ভয়াল স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে। মহাদেশজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ ও দীর্ঘস্থায়ী গরমে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৬২ হাজার ৭০০ জন মানুষ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস ক্লাইমেট সার্ভিস জানিয়েছে, গত বছরের গ্রীষ্ম ছিল ইউরোপের রেকর্ড করা ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ। সেই তাপমাত্রা শুধু প্রকৃতির অস্বাভাবিক রূপই প্রকাশ করেনি, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ সংকটও ডেকে এনেছে।
আন্তর্জাতিক সাময়িকী নেচার মেডিসিন-এ প্রকাশিত এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মাত্র চার মাসে—২০২৪ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত—ইউরোপে ৬২ হাজার ৭০০ জন মানুষ গরমে মারা যান। গবেষকরা জানিয়েছেন, মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি ছিল বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এবং নারীদের মৃত্যু পুরুষদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হয়েছে। তারা সতর্ক করে বলেন, এই প্রবণতা চলতে থাকলে ইউরোপজুড়ে জনস্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে।
স্পেনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা বার্সেলোনা ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথ-ও একই ধরনের উপসংহার টেনেছে। তাদের জরিপে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের মাত্র এক গ্রীষ্মেই ইউরোপে প্রায় ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গবেষকরা ৩২টি দেশের মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করেছেন। দেখা গেছে, ২০২৩ সালের তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। যদিও ২০২২ সালে ইউরোপজুড়ে আরও ভয়াবহ তাপপ্রবাহ হয়েছিল, যার প্রভাব ২০২৪ সালের তুলনায়ও বেশি প্রাণঘাতী ছিল। ২০২২ থেকে ২০২৪—এই তিন গ্রীষ্মে মিলে মহাদেশজুড়ে তীব্র গরমে প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৮১ হাজারের বেশি।
ইউরোপ আগেও তাপপ্রবাহের ভয়াবহ রূপ দেখেছে। ২০০৩ সালের গ্রীষ্মে অস্বাভাবিক গরমে ৭০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। ২০১০ সালে রাশিয়ায় তাপপ্রবাহ ও দাবানলে প্রাণ হারান আরও কয়েক হাজার মানুষ। ২০১৯ সালে প্যারিস ও বার্লিনে আবারও ভেঙে যায় পুরনো রেকর্ড। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বাড়তে থাকবে এবং এর প্রভাব মানুষের জীবনে ভয়ঙ্কর বিপর্যয় নামিয়ে আনবে। তাদের সেই পূর্বাভাস যেন পুরোপুরিই প্রতিফলিত হয়েছে ইউরোপের গত তিনটি গ্রীষ্মে।
২০২৪ সালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ইতালি। দেশটিতে তীব্র গরমে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ১৯ হাজার মানুষ। স্পেনে মারা গেছেন ছয় হাজার ৭০০ জনেরও বেশি, জার্মানিতে প্রায় ছয় হাজার ৩০০, গ্রিসে ছয় হাজার এবং রোমানিয়ায় প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ। তবে জনসংখ্যার অনুপাতে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি ছিল গ্রিসে—প্রতি ১০ লাখে ৫৭৪ জন। এরপরেই রয়েছে সার্বিয়া ও বুলগেরিয়া।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপের দক্ষিণাঞ্চল তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এখানে উষ্ণ জলবায়ু ও বয়স্ক জনসংখ্যার সংখ্যা বেশি। ফলে গরমের প্রকোপে মৃত্যুর হারও বেড়ে যায়।
বিজ্ঞানীদের মতে, ইউরোপে তাপপ্রবাহের ঘন ঘন প্রকোপ সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল। কার্বন নিঃসরণ, বন ধ্বংস, নগরায়ণ এবং গ্রীনহাউস প্রভাবের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়ছে। ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থা সতর্ক করেছে, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহ আরও ভয়াবহ রূপ নেবে এবং এর সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব হবে গভীর।
তাপপ্রবাহ শুধু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়াচ্ছে না, বরং স্বাস্থ্যসেবার ওপরও ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে। গরমের কারণে হিটস্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন, হৃদ্রোগ, শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়ে যাচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ইউরোপে তাপপ্রবাহ আরও নিয়মিত হবে এবং মৃত্যুর সংখ্যা ভয়াবহভাবে বাড়তে পারে। একদিকে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমানো, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো—এই দুই দিকেই জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি নগর পরিকল্পনা, সবুজায়ন, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
তীব্র গরম ও মৃত্যুর মিছিল ইউরোপীয় সমাজে উদ্বেগ তৈরি করেছে। নাগরিকদের একাংশ মনে করছেন, সরকারগুলো জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় যথেষ্ট আন্তরিক নয়। অন্যদিকে পরিবেশবাদীরা বলছেন, এখনই যদি বড় ধরনের পদক্ষেপ না নেওয়া হয় তবে আগামী দশকে ইউরোপে মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা আরও ভয়াবহ হবে।
সব মিলিয়ে, ইউরোপে ২০২৪ সালের গ্রীষ্মকাল শুধু এক ভয়ঙ্কর জলবায়ু বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে আসেনি, বরং মানবজাতির জন্যও এক অশনি সংকেত বয়ে এনেছে। জলবায়ু পরিবর্তন আর কোনো দূরের ভবিষ্যতের বিষয় নয়, এটি এখনই মানবজীবন কেড়ে নিচ্ছে। আর সেই বাস্তবতা সবচেয়ে নির্মমভাবে প্রতিফলিত হয়েছে ইউরোপের প্রাণঘাতী গরমের মাঝে।