আজ দেবীর বোধন, কাল মহাষষ্ঠী: শারদীয় দুর্গোৎসবে বাঙালির প্রাণের উৎসব

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৩২ বার
মহাষষ্ঠীতে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলার আকাশে শরতের শুভ্র কাশফুল দোলে, হাওয়ায় ভেসে আসে উৎসবের আমেজ, শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত চারদিকে বাজতে শুরু করেছে ঢাকের বাদ্য। আজ শনিবার দেবীর বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা, আর আগামীকাল রবিবার মহাষষ্ঠীর পূজা দিয়ে শুরু হবে মূল অনুষ্ঠানমালা। বাঙালির সবচেয়ে বড় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবকে ঘিরে মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি, সাজসজ্জা, আলোকমেলা আর প্রতিমার শোভায় ভরে উঠছে প্রতিটি এলাকা।

বোধন শব্দটির অর্থ জাগরণ বা চৈতন্যপ্রাপ্তি। পৌরাণিক কাহিনীতে জানা যায়, রাক্ষসরাজ রাবণ বধের আগে ভগবান রাম শরৎকালে দুর্গাপূজা করেছিলেন। যেহেতু এটি শাস্ত্রের নির্ধারিত সময় ছিল না, তাই সেই পূজার নামকরণ হয় অকালবোধন। সেই থেকে শরৎকালের দুর্গাপূজায় দেবীর বোধনের বিধান চালু রয়েছে। অন্যদিকে চৈত্র মাসে যে বাসন্তীপূজা হয়, সেখানে বোধনের কোনো প্রয়োজন হয় না।

সাধারণত ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় দেবীর বোধন হয়। তবে এ বছর পঞ্জিকার নিয়মে দেখা গেছে ষষ্ঠী তিথি গভীর রাতে শুরু হচ্ছে, আর পরদিনও পূর্ণভাবে সন্ধিকাল মিলছে না। তাই শাস্ত্রসম্মত নিয়ম মেনে আজ শনিবার অর্থাৎ পঞ্চমীর সন্ধ্যাতেই অনুষ্ঠিত হবে দেবী দুর্গার বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস। এ কারণেই আজকের দিনটি ধর্মীয়ভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আজ বোধন শেষে কাল রবিবার অনুষ্ঠিত হবে ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠী বিহিত পূজা। এরপর ধারাবাহিকভাবে মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী, মহানবমী পালন শেষে আগামী ২ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটবে দুর্গোৎসবের। সেই দিন প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বিদায় নেবেন দেবী দুর্গা। পুরাণ মতে, এ বছর দেবীর আগমন ঘটছে গজে অর্থাৎ হাতির পিঠে। এটি শাস্ত্র অনুযায়ী শুভ লক্ষণ বহন করে, কারণ হাতির আরোহন সমৃদ্ধি ও শান্তির প্রতীক। তবে দশমীতে দেবী মর্ত্যলোক ছাড়বেন দোলায় বা পালকিতে, যা বিচ্ছেদের বেদনার সঙ্গে বিদায়ের রঙও মিশিয়ে দেবে।

ঢাকায় এবারের দুর্গোৎসবে মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। গতবার যেখানে ২৫২টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, এবার সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫৯-এ। রাজধানীর প্রতিটি এলাকার বড় বড় মণ্ডপগুলোতে সাজসজ্জার কাজ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। ঢাকার পাশাপাশি সারা দেশেও এবার মণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে এবার মোট ৩৩ হাজার ৩৫৫টি মন্দির-মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা গতবারের তুলনায় প্রায় এক হাজার বেশি। এই সংখ্যা শুধু ধর্মীয় উৎসবের ব্যাপ্তিকেই নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের বিস্তারকেও প্রমাণ করে।

গ্রামের মণ্ডপে প্রতিমা গড়ার কাজ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। এখন চলছে রঙ তুলির শেষ আঁচড়, প্রতিমাকে দেবী রূপে শোভিত করার পালা। শহরের মণ্ডপগুলোতে আধুনিক আলোকসজ্জা, থিমভিত্তিক সাজসজ্জা এবং নিরাপত্তার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঢাকের বাজনা, শঙ্খধ্বনি, ধূপ-ধুনোর গন্ধে প্রতিটি পূজা মণ্ডপ যেন এক উৎসবের আবেশে ভাসছে। প্রতিমার সামনে ভক্তদের ঢল নামার অপেক্ষা আর কয়েক ঘণ্টার।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দুর্গোৎসবকে ঘিরে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে পূজার সাজসজ্জা, প্রতিমা দর্শন, ধুনুচি নাচের মহড়া কিংবা ঢাক-ঢোলের সুরে নাচের ভিডিও এখন আলোচনার শীর্ষে। বাংলাদেশ থেকে শুরু করে বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিরা অনলাইনের মাধ্যমে এই আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছেন। অনেকে বলছেন, দূরে থেকেও তারা মণ্ডপের উৎসবমুখরতা উপভোগ করতে পারছেন।

ঢাকার রমনা কালীমন্দির, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, বনানী পূজা মণ্ডপ কিংবা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বড় মণ্ডপগুলো ইতিমধ্যেই দর্শনার্থীদের ভিড়ে জমজমাট হয়ে উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, পূজা উপলক্ষে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা, পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন এবং স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী কাজ করছে যাতে ভক্তরা নির্বিঘ্নে উৎসব উপভোগ করতে পারেন।

ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দুর্গোৎসব বাঙালির সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই এই উৎসব কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে একটি সর্বজনীন সামাজিক-সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় রূপ নেয়। ঢাকায় যেমন মুসলিম প্রতিবেশীরা পূজা মণ্ডপে গিয়ে অংশ নিচ্ছেন, তেমনি গ্রামে গ্রামে পূজা উপলক্ষে আয়োজন হচ্ছে নাটক, যাত্রাপালা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং মেলার। বলা চলে, দুর্গোৎসব এখন বাঙালির জীবনে আনন্দ, ভ্রাতৃত্ব এবং মিলনের প্রতীক।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই উৎসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিমা গড়া, আলোকসজ্জা, সাজসজ্জা, মেলা এবং বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার মানুষ অস্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ পান। কারিগর, শিল্পী, ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এ সময় অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ পান। ফলে দুর্গোৎসব গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

এ বছর পূজার সময় আবহাওয়া তুলনামূলক অনুকূলে রয়েছে বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে। তবে সাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে সামান্য বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকলেও তা উৎসবের আমেজে বিশেষ কোনো প্রভাব ফেলবে না। বরং অনেকেই মনে করছেন, হালকা বৃষ্টিতে উৎসবের আনন্দ আরও বাড়বে।

দুর্গোৎসবের অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ ধুনুচি নাচ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো। ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত প্রতিটি রাতে মণ্ডপে মণ্ডপে আয়োজিত হবে সংগীতানুষ্ঠান, নাচ-গান এবং নাট্যমেলা। বিশেষ করে মহানবমীর রাতে আয়োজিত ধুনুচি নাচ প্রতিযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনা দর্শকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বিশ্বের যেসব দেশে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে, সেখানেও আজ দেবীর বোধনের মাধ্যমে দুর্গোৎসব শুরু হচ্ছে। লন্ডন, নিউইয়র্ক, টরন্টো কিংবা সিডনির পূজা মণ্ডপগুলোতেও একই আমেজ বিরাজ করছে।

সবশেষে বলা যায়, আজকের দেবীর বোধন কেবল এক ধর্মীয় আচারই নয়, বরং এটি বাঙালির প্রাণের উৎসবের সূচনা। আগামী পাঁচ দিন ভক্তরা মাতবে আনন্দে, ভ্রাতৃত্বে, ধর্মীয় আচার ও সাংস্কৃতিক আবেগে। আজকের রাত থেকে শুরু হওয়া এই উৎসব বিজয়ার দিনে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হলেও এর আনন্দ, শিক্ষা এবং ঐক্যের বার্তা বহাল থাকবে আগামী বছর পর্যন্ত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত