অসহনীয় যন্ত্রণা-শোকে কাতর আমি: থালাপতি বিজয়

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৫০ বার
অসহনীয় যন্ত্রণা-শোকে কাতর আমি: থালাপতি বিজয়

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যে তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম (টিভিকে) দলের এক জনসভায় পদদলিত হয়ে অন্তত ৩৯ জন মানুষের মৃত্যু এবং শত শত আহত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতদের মধ্যে শিশু ও নারীও রয়েছেন। জনপ্রিয় অভিনেতা থেকে রাজনৈতিক নেতায় রূপান্তরিত থালাপতি বিজয়, যিনি টিভিকে দলের প্রধান, ঘটনাটিকে জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ ও অসহনীয় শোক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, “আমার হৃদয় ভেঙে গেছে। অসহনীয় যন্ত্রণা ও শোকে কাতর আমি। প্রাণ হারানো আমার প্রিয় ভাই-বোনদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।”

শনিবার সন্ধ্যায় কারুর জেলার বিশাল এক সমাবেশে এই দুর্ঘটনা ঘটে। এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহতদের মধ্যে ৯ শিশু এবং ১৭ নারী রয়েছেন। আহতদের সংখ্যা অন্তত ৫০০, যাদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। ভিড়ের চাপে বহু মানুষ অজ্ঞান হয়ে পড়েন, কেউ কেউ গুরুতরভাবে আহত হন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগগুলোতে হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয় চিকিৎসকদের।

ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন বিজয় একটি বাসের ছাদে উঠে জনতার উদ্দেশে বক্তব্য রাখছিলেন। কয়েকজন অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে সমাবেশস্থলে পানির বোতল ছোড়া শুরু হয়। বোতল সংগ্রহের জন্য মানুষ হুড়োহুড়ি শুরু করলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পদদলনের ভয়াবহতায় মুহূর্তের মধ্যেই প্রাণহানি ঘটে। বিশৃঙ্খলার কারণে বিজয় মাঝপথে বক্তব্য থামিয়ে দেন। পরে পুলিশ ও প্রশাসন আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়, তবে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায়ও বিপাকে পড়তে হয় তাদের।

তামিলনাড়ুর পুলিশ জানিয়েছে, ওই সমাবেশে আনুমানিক ৩০ হাজার মানুষের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, বাস্তবে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। এত বিশাল ভিড় সামলাতে প্রশাসনের প্রস্তুতি যে যথেষ্ট ছিল না, তা ঘটনাটির পর স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এম. কে. স্টালিন গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছেন, পদদলনের ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অরুণা জগদেশনের নেতৃত্বে এই তদন্ত কমিশন কাজ করবে। তিনি আরও বলেন, নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা এবং আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেবে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এই ঘটনাকে “অত্যন্ত বেদনাদায়ক” বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি নিহত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন। মোদি উল্লেখ করেন, “এই শোকসন্তপ্ত সময়ে আমরা সবাই তামিলনাড়ুর মানুষের পাশে আছি।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই দুর্ঘটনা শুধু মানবিক ট্র্যাজেডিই নয়, বরং আসন্ন তামিলনাড়ুর রাজনীতির জন্যও একটি বড় ধাক্কা। আগামী বছরই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে বিজয় তার দল টিভিকেকে শক্তিশালী করতে দফায় দফায় জনসভা ও মিছিল করছেন। তাঁর জনপ্রিয়তা যেমন বিশাল, তেমনি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্যও তিনি প্রচারে নেমেছেন জোরকদমে। তবে এই দুর্ঘটনা তাঁর রাজনৈতিক যাত্রায় এক অনাকাঙ্ক্ষিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।

জনসভায় অংশ নেওয়া প্রত্যক্ষদর্শীরা জানাচ্ছেন, মানুষের ঢল এতটাই তীব্র ছিল যে শ্বাস নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। অনেকেই পানির বোতল সংগ্রহ করতে গিয়ে পড়ে যান এবং পেছনের ভিড় তাদের মাড়িয়ে এগিয়ে যায়। কিছু মানুষ চিৎকার করে থামতে বললেও, আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে কারও ডাক আর শোনা যাচ্ছিল না।

তামিলনাড়ুর ইতিহাসে পদদলিত হয়ে প্রাণহানির ঘটনা নতুন নয়। এর আগে ধর্মীয় উৎসব কিংবা রাজনৈতিক সমাবেশে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে এত বড় সংখ্যক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে আর দেখা যায়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, প্রশাসনের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি কতটা কার্যকর ছিল। স্থানীয় পত্রিকাগুলো বলছে, বিজয়ের জনপ্রিয়তা এবং জনসমাগমের মাত্রা আগেই আন্দাজ করা যেত, কিন্তু সেই অনুযায়ী নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ছিল না।

রাজনৈতিক মহল মনে করছে, এই দুর্ঘটনা নির্বাচনী প্রচারে প্রভাব ফেলতে পারে। বিজয়ের জনপ্রিয়তা যে এখনও তুঙ্গে, তা এই বিশাল জনসমাগমেই প্রমাণিত। তবে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁর দলকে কঠিন সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে। তবুও বিজয়ের দ্রুত প্রতিক্রিয়া, শোকপ্রকাশ এবং পরিবারগুলোর প্রতি সহমর্মিতা রাজনৈতিকভাবে তাঁকে সহানুভূতির অবস্থানে রাখতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশের পাশাপাশি নানা প্রশ্নও উঠছে। অনেকে বলছেন, জনসভায় এমন বিশাল ভিড় অনুমোদনের বাইরে গিয়ে তৈরি হয়েছিল। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, প্রশাসনের ভূমিকা ছিল কতটা সক্রিয়। আবার কেউ কেউ দাবি করছেন, জনতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দলীয় সংগঠকরা যথেষ্ট প্রস্তুতি নেননি। এই বিতর্ক এখন পুরো তামিলনাড়ু জুড়েই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

মানবিক এই বিপর্যয়ের মধ্যেই রাজনীতি চলছে। তবে নিহতদের পরিবারগুলো এখন গভীর শোকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। স্থানীয় টেলিভিশনে দেখানো হয়েছে, কারুর জেলার গ্রামগুলোতে শোকের মাতম। একসঙ্গে এতগুলো লাশ দাফন বা দাহ করার দৃশ্য মানুষকে হতবাক করে দিয়েছে। আহতদের অনেকে এখনও হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ভিড়ে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এবং চাপের কারণে অভ্যন্তরীণ আঘাতে অনেকেই গুরুতর অবস্থায় আছেন।

অভিনেতা থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা বিজয়ের জন্য এই ঘটনা নিঃসন্দেহে এক কঠিন পরীক্ষা। জনসভায় বিপুল জনসমাগম তাঁর জনপ্রিয়তার প্রতীক হলেও, নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় এই বিপর্যয় তাঁর ভাবমূর্তিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। রাজনৈতিকভাবে তিনি কতটা ক্ষতি সামলাতে পারবেন, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত তামিলনাড়ুর মানুষ শোকের সাগরে ডুবে আছে, আর দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছেন থালাপতি বিজয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত