প্রকাশ: ২৯সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রবাসীদের ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কাজে দলীয় নেতাকর্মীদের সক্রিয় ভূমিকা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থানরত বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে আলাপকালে তিনি এই নির্দেশ দেন। রবিবার স্থানীয় সময় দুপুরে দেওয়া এ বক্তব্য ইতোমধ্যেই প্রবাসী বিএনপির রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং দেশের রাজনীতিতেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রবাসীদের ভোটাধিকার এবং বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয়। প্রায় প্রতিটি নির্বাচনের আগে-বরে এ নিয়ে বিতর্ক ও দাবি ওঠে। বিএনপি এবার বিষয়টিকে নতুন করে রাজনৈতিক এজেন্ডা হিসেবে সামনে নিয়ে আসছে বলেই মনে করা হচ্ছে। তারেক রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, বিএনপির নেতাকর্মীদের শুধু বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সরাসরি প্রবাসীদের ভোটার করার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে হবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় নির্বাচন কমিশন এবং বিদেশি দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
এসময় তারেক রহমানের সঙ্গে ফোনে সংযুক্ত ছিলেন বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন খোকন। তার মোবাইল ফোন থেকেই লাউডস্পিকারে বক্তব্য শোনেন উপস্থিত নেতাকর্মীরা। সেখানে ছিলেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আব্দুল লতিফ সম্রাট, মহিলা দলের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক মমতাজ আলো, নিউইয়র্ক স্টেট বিএনপির নেতা রিয়াজ মাহমুদ, জিল্লুর রহমান জিল্লু, গিয়াস আহমেদ, সবুর খান, জসীম উদ্দিন ভূঁইয়া, অলিউল্লাহ আতিকুর রহমান, আহবাব চৌধুরী খোকন, আবু সাঈদ আহমেদ, সাইদুর রহমান সাইদ, বদিউল আলম, ফয়েজ চৌধুরীসহ আরও অনেকে।
ফোনালাপে তারেক রহমান উল্লেখ করেন, শুধু দায়িত্ব অর্পণ করলেই হবে না, সবাইকে নির্দিষ্ট কাজের দায়িত্ব নিতে হবে এবং কার্যকরভাবে সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে যেমন নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চান এবং ভোটার তালিকার নামগুলো নিশ্চিত করেন, আপনাদেরও সেভাবে কাজ করতে হবে। অনেক প্রবাসীকে এখনো এনআইডি করাতে হবে। যারা সামর্থ্যবান, তারা নিশ্চয়ই বসে থাকবেন না।”
তারেক রহমানের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল প্রবাসী ভোটারদের সম্ভাব্য সংখ্যা নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ। তিনি বলেন, “বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি ভোটার রয়েছে। যদি প্রবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তাহলে মোট ভোটারের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১৩ কোটি। প্রবাসে অন্তত ৫০ লাখ বাংলাদেশি আছেন, যারা ভোটার হওয়ার যোগ্য। এই সংখ্যা বিরাট। যদি এই ভোট ব্যাংককে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে বিএনপির জন্য তা হবে একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি।”
বিএনপি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, “আপনাদের বুঝতে হবে নির্বাচন কমিশনের নিয়ম কী, বিদেশি দূতাবাস ও কনস্যুলেটে কীভাবে প্রবাসীরা নাম নিবন্ধন করতে পারেন, সেটা যাচাই করে নিতে হবে। তারপর সুসংগঠিতভাবে এগোতে হবে।”
প্রবাসীদের ভোটার বানানোর এ উদ্যোগকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, এটি বিএনপির কৌশলগত পদক্ষেপ। প্রবাসী বাংলাদেশিরা শুধু অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নন, রাজনৈতিকভাবেও তাদের প্রভাব যথেষ্ট। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসীরা নিয়মিত রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন। সেই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নানা মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতেও সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। তাদের ভোটাধিকার কার্যকর হলে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হতে পারে।
এমনকি দলীয় মহলেও অনেকে মনে করছেন, প্রবাসীদের ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হলে শুধু বিএনপি নয়, আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলও এই প্রতিযোগিতায় নামবে। ফলে প্রবাসীদের ভোট এখন আর কেবল তাত্ত্বিক দাবি নয়, বরং বাস্তব রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সামনে আসবে।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের নীতিমালা অনুযায়ী প্রবাসীরা যদি ভোটার হিসেবে নাম অন্তর্ভুক্ত করতে চান, তাহলে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র থাকতে হবে এবং নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হবে। এ প্রক্রিয়া অনেকের কাছে জটিল মনে হলেও সংগঠিতভাবে কাজ করলে তা সম্ভব বলে মনে করছেন বিএনপির নেতারা।
তবে এই নির্দেশকে ঘিরে সমালোচনাও রয়েছে। বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা বলছেন, তারেক রহমানের এই বক্তব্য মূলত প্রবাসীদের আবেগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা। তাদের মতে, প্রবাসীরা ভোটাধিকার পেলেও দেশে এসে ভোট দেওয়ার সুযোগ সীমিত। তাই এটি কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য, যার বাস্তবায়ন সহজ নয়। তবে বিএনপি নেতারা পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলছেন, প্রযুক্তির যুগে ভোট দেওয়ার পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে, সেক্ষেত্রে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পথ তৈরি হবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রবাসীদের গুরুত্ব নতুন নয়। অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে প্রবাসী বাংলাদেশিরা সংগঠিতভাবে অর্থ ও মনোবল জুগিয়েছেন। এবার যদি তারা সরাসরি ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে পারেন, তবে তা ভবিষ্যতের নির্বাচনে প্রভাব ফেলবেই। বিএনপির ভেতরে অনেকে বিশ্বাস করেন, প্রবাসীরা দলটির প্রতি সহানুভূতিশীল এবং তাদের ভোট পেলে বিএনপির অবস্থান শক্তিশালী হবে।
এখন প্রশ্ন থেকে যায়, এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব এবং কত দ্রুত। কারণ নির্বাচন কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যদিকে, প্রবাসীদের ভোটার করতে হলে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোকেও সক্রিয় হতে হবে। এর বাইরে রয়েছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও রাষ্ট্রীয় নীতির বিষয়।
তারেক রহমানের নির্দেশ প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রশ্নে নতুন আলোচনার জন্ম দিলেও সামনে অনেক বাধা আছে। তবে এটুকু স্পষ্ট—বিএনপি এখন প্রবাসীদের ভোটকে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। যদি এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।