পটিয়ায় বেড়েছে অপরাধের দৌরাত্ম্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৬৩ বার
পটিয়ায় বেড়েছে অপরাধের দৌরাত্ম্য: চুরি-ছিনতাইয়ে আতঙ্কিত জনজীবন

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাবনতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও উদ্বেগ দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। একসময় শান্তিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত এই জনপদে গত কয়েক মাসে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে স্থানীয়রা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সকাল-বিকেল, এমনকি গভীর রাত পর্যন্ত অপরাধীদের তৎপরতায় জনজীবনে নেমে এসেছে আতঙ্কের ছায়া।

বিশেষ করে অটোরিকশা বা টমটম ভাড়া করে নির্জন স্থানে যাত্রীদের নিয়ে যাওয়া, তারপর ছুরি, চাপাতি কিংবা ধারালো অস্ত্র বের করে ফিল্মি কায়দায় সবকিছু লুট করার ঘটনা প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। প্রতিরোধের চেষ্টা করলে যাত্রীদের উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত বা নির্দয় মারধরের ঘটনাও ঘটছে। ফলে কখন কে কোথায় অপরাধীদের টার্গেটে পড়বে, তা অনুমান করা দুষ্কর হয়ে উঠেছে।

এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানো হলেও ভুক্তভোগীদের অনেকে দাবি করছেন, সেখান থেকেও যথাযথ প্রতিকার মেলে না। অন্যদিকে, দুর্গাপূজা সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলার আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে পূজা কেন্দ্রিক বিশেষ নজরদারি চালানোর আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তবু জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা কাটছে না।

পটিয়ায় গত দুই মাসেই বেশ কয়েকটি ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, যা স্থানীয়দের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সর্বশেষ ২৬ সেপ্টেম্বর দুপুরে ইন্দ্রপুল বাইপাস এলাকায় প্রবাসী শাখাওয়াত হোসেন ছিনতাইয়ের শিকার হন। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা তাকে ঘিরে ধরে মোবাইল ফোন ও নগদ অর্থ লুট করে নেয়। একই দিনে রেললাইনের পাশে অজ্ঞাত এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা এলাকায় আরও আতঙ্ক ছড়ায়।

এর আগে ১৭ সেপ্টেম্বর সকালে মুন্সেফ বাজার থেকে ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম আরজুকে অপহরণ করে দুর্বৃত্তরা। তাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ১৭ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরে স্থানীয়দের তৎপরতায় ধলঘাট ইউনিয়নের একটি মাছের প্রজেক্ট এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু অপহরণকারীদের একজনকে চিনে ফেলায় ১৮ সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগের এক নেতা ফাহিমের হাতে খুন হন ওমান প্রবাসী মো. মামুন।

এ ছাড়া ২ সেপ্টেম্বর রাতে দক্ষিণ ভুর্ষির কেঁচিয়াপাড়ায় ছিনতাইকারীর হাতে খুন হন রিকশাচালক মো. শহীদ। আবার ৪ সেপ্টেম্বর বাইপাস এলাকায় বিকাশ এজেন্ট দেলোয়ারের কাছ থেকে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা ছিনতাই করা হয়। একের পর এক চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের এসব ঘটনায় জনমনে ভয়ের পরিবেশ বিরাজ করছে।

অপরাধ শুধু নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ নেই, বরং পটিয়া পৌরসভা ও বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রায় সব এলাকায় এর বিস্তার ঘটেছে। কেলিশহর, হাইদগাঁও, কচুয়া, জঙ্গলখাইন, ছনহরা, হাবিলাসদ্বীপ, শান্তিরহাট, কোলাগাঁও থেকে শুরু করে বাইপাসের ভাটিখাইন পয়েন্ট, বাকখালী পয়েন্ট কিংবা আনোয়ারা সড়কের সংলগ্ন স্থানে প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনো অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। বিশেষ করে বাসা-বাড়ি, হাসপাতাল, দোকানপাট, মসজিদ এমনকি রাস্তায় চলাচলরত যাত্রীদের উপর হামলা ও লুটপাটের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে।

অপহরণ থেকে ফিরে আসা ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম আরজু গণমাধ্যমে জানান, অপহরণকারীরা অস্ত্রের মুখে তাকে ১৭ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিতে বাধ্য করে। পরবর্তীতে আরও ৪ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিতে পারায় তাকে মারধর ও গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়। তবে স্থানীয়দের দ্রুত তৎপরতায় তিনি প্রাণে রক্ষা পান।

ভাটিখাইন গ্রামের সমাজসেবক আশিকুল মোস্তফা তাইফু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সন্ধ্যার পর বাইপাস সড়কটি অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়। নিয়মিত অপরাধের পরও কেন পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।

অপরদিকে, পটিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. নুরুজ্জামান দাবি করেছেন, পটিয়ার আইনশৃঙ্খলা যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন ভালো আছে। তিনি জানান, পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে থানা পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করছে এবং ইতোমধ্যে কয়েকজন অপরাধীকে আটক করা হয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ ও জনগণের সহযোগিতা নিয়ে একটি নিরাপদ, সন্ত্রাসমুক্ত পটিয়া গড়ে তোলার আশ্বাস দেন তিনি।

তবে পুলিশের এ বক্তব্যে অনেকেই আস্থা রাখতে পারছেন না। প্রতিদিনের অপরাধের ধারাবাহিকতায় পটিয়ার সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। বিশেষ করে কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য, মাদক ব্যবসার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক ছত্রছায়া স্থানীয়দের মনে আরও প্রশ্ন তৈরি করছে।

সামাজিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো বেকারত্ব, মাদক ব্যবসা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রশাসনিক তৎপরতার দুর্বলতা, যার কারণে অপরাধীরা বারবার অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে।

পটিয়ায় আইনশৃঙ্খলার এই অবনতির ফলে সাধারণ মানুষ যেমন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে, তেমনি প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। দুর্গাপূজার মতো বড় উৎসবের সময়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা স্থানীয়দের মধ্যে বিরাজ করছে। এখনই যদি কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে পটিয়ার অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঠিক তৎপরতা, স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছাই পারে পটিয়াকে আবারও নিরাপদ জনপদে পরিণত করতে। তবে তার আগে প্রয়োজন প্রশাসনের আন্তরিকতা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ। অন্যথায় পটিয়ার মানুষকে হয়তো আরও দীর্ঘদিন নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত