বিসিবির আলোচিত নির্বাচন আজ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৫
  • ২৯ বার

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচন ঘিরে যে আলোচনার ঝড় সৃষ্টি হয়েছিল, তা আজকের ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে পরিণতি পেতে যাচ্ছে। দেশের বাইরে জাতীয় পুরুষ ও নারী দল মাঠে প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করছে, দেশের পতাকা উঁচিয়ে ধরার চেষ্টা করছে, অথচ ঢাকায় ক্রিকেটপ্রেমীদের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে আছে বোর্ড নির্বাচনে। বিসিবির চেয়ার দখল এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা নিশ্চিত করার দৌড়ে ব্যস্ত দেশের প্রভাবশালী সংগঠকরা। মাঠের খেলার খবর যেন নির্বাচনী লড়াইয়ের কাছে চাপা পড়ে গেছে। গত কয়েক মাস ধরে এই নির্বাচনকে ঘিরে দৌড়ঝাঁপ ও নাটক এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যে আদালতেরও শরণাপন্ন হতে হয়েছে পক্ষ-বিপক্ষকে। অবশেষে আজ, দীর্ঘ বিতর্ক ও নাটকীয়তার পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে দেশের সবচেয়ে আলোচিত ক্রিকেট নির্বাচন।

বাংলাদেশে বিসিবির নির্বাচন কখনো এতটা আলোচিত বা সমালোচিত হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও এটি আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। ক্রিকেটপ্রেমী সাধারণ মানুষের মুখেও প্রশ্ন, বিসিবির নির্বাচনে এমন আকর্ষণের কারণ কী। সবাই দাবি করছেন ক্রিকেটকে বাঁচাতে, উন্নত করতে এবং বিশ্বমঞ্চে আরও এগিয়ে নিতে তারা নেতৃত্ব চান। কিন্তু বাস্তবে নির্বাচনকে ঘিরে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা বোঝাচ্ছে যে ক্ষমতার রাজনীতি এবং ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানোর প্রবণতাই এখানে বেশি বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আদালতে মামলা, পাল্টা মামলা, সংবাদ সম্মেলন, পাল্টা সংবাদ সম্মেলন—সবকিছু মিলে এবারের নির্বাচন এক জটিল নাট্যকাহিনিতে রূপ নিয়েছে।

এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় খবর হয়ে উঠেছেন অভিষেক টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান আমিনুল ইসলাম বুলবুল। তিনি গতকাল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিসিবির নির্বাচিত পরিচালক হয়েছেন। জামালপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল ফুয়াদ রেদুয়ান মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেওয়ায় বুলবুল নির্বাচিত হন বিনা ভোটে। একইভাবে নাজমুল আবেদিন ফাহিমও পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন। বুলবুলকে কেন্দ্র করেই এবারের নির্বাচনের মূল স্রোত তৈরি হয়েছে। বোর্ড পরিচালনায় তার প্রত্যাবর্তনকে অনেকেই স্বাগত জানালেও সমালোচনাও রয়েছে। আজ সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে ভোটগ্রহণ চলবে। এখানে ২৫ পরিচালকের পদের মধ্যে দুইজন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের মনোনীত এবং বাকি ২৩টি পদ নির্ধারণ হবে কাউন্সিলরদের ভোটে। এর মধ্যে ইতিমধ্যেই আটজন পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন, বাকি ১৫টি পদের জন্য হচ্ছে আজকের ভোট। নির্বাচিতদের নাম ঘোষণা হওয়ার পর নতুন বোর্ড পরিচালকরা সভায় বসে সভাপতি ও সিনিয়র সহসভাপতি নির্বাচিত করবেন। যদিও বোর্ডের অভ্যন্তরে ইতিমধ্যেই নিশ্চিত হয়ে গেছে, সভাপতি হচ্ছেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। আজ কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি।

বুলবুল নিজেও নির্বাচনী লড়াইকে বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন। তিনি সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, যেদিন বাংলাদেশের দুই দলই জিতেছে—পুরুষ দল আফগানিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে এবং নারী দল বিশ্বকাপে—সেদিনও মূল আলোচনায় ছিল বিসিবির নির্বাচন। এটিই প্রমাণ করে ক্রিকেট মাঠের খেলা নয়, প্রশাসনিক নির্বাচনই এখন আসল খবর। অন্যদিকে রেদুয়ান মনোনয়ন প্রত্যাহার করে বলেন, দেশের নির্বাচনী আলোচনাকেও ছাড়িয়ে গেছে বিসিবির নির্বাচন।

আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সঙ্গে বোর্ডের সম্পর্ক নতুন নয়। তিনি একসময় সরকারের সিদ্ধান্তে বিসিবির সভাপতি হয়েছিলেন স্বল্প সময়ের জন্য। কিন্তু এবার তিনি নির্বাচিত হয়ে সেই আসনে বসছেন। তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে আইসিসিতে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে। দেশীয় ক্রিকেট অঙ্গনে তখন থেকেই তাকে প্রশ্ন করা হতো কেন তিনি দেশের হয়ে কাজ করছেন না। এবার তিনি নিজেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তবে এর পেছনে সহজ পথ ছিল না। নির্বাচনকেন্দ্রিক টানাপোড়েনে তাকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে তিনি বলেছেন, এই দৌড়ঝাঁপের কারণে তার শারীরিক অবস্থারও পরিবর্তন ঘটেছে, ওজন কমে গেছে।

এবারের নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক শুরু হয় কাউন্সিলর মনোনয়ন নিয়ে। সভাপতি হিসেবে বুলবুল নিজে স্বাক্ষর করে কাউন্সিলর পাঠানোর চিঠি দিয়েছিলেন। বিরোধীরা অভিযোগ তোলে, এটি একক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নিয়মবহির্ভূত পদক্ষেপ। কিন্তু বুলবুল সরাসরি সংবাদমাধ্যমে দাবি করেন, এটি তার একক ক্ষমতার মধ্যেই পড়ে এবং তিনি যথাযথ নিয়ম মেনে কাউন্সিলর মনোনয়ন দিয়েছেন। তার দাবি ছিল, ক্রিকেট সংগঠক ও সাবেক খেলোয়াড়দের কাউন্সিলর বানানোর অনুরোধই তিনি করেছেন।

পরবর্তী সময়ে আরও বড় নাটক তৈরি হয় ১৫ ক্লাবের ভোটাধিকার নিয়ে। খসড়া ভোটার তালিকায় তাদের নাম না থাকায় সাবেক সভাপতি ফারুক আহমেদ আদালতের দ্বারস্থ হন। আদালত রায় দিয়ে এই ১৫ ক্লাবের ভোটাধিকার স্থগিত করে। এর ফলেই জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল এবং তার প্যানেলের প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। তামিম বিদেশেও চলে যান। এতে বোর্ড নির্বাচনের ভারসাম্য অনেকটা ভেঙে পড়ে। তবে পরে আদালতের রায়ে ১৫ ক্লাবের ভোটাধিকার ফেরত আসে। এতে নির্বাচনের মোড় আবারও পাল্টে যায়।

এই ১৫ ক্লাবের প্রার্থীদের মধ্যে ইস্রাফিল খসরু ও ইফতেখার রহমান মিঠু ছিলেন আলোচনায়। বিএনপি নেতা আমীর খসরুর ছেলে ইস্রাফিল খসরু শেষমেশ প্রার্থীতা প্রত্যাহার করলেও ইফতেখার রহমান মিঠু মাঠে থেকে যান। যদিও তার অবস্থান ঘিরে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এদিকে, নির্বাচনকে স্থিতিশীল করার জন্য মোহামেডানের মাসুদউজ্জামান ও ইন্দিরা রোড ক্রীড়া চক্রের রফিকুল ইসলাম বাবু সমঝোতার চেষ্টা করেছিলেন। তারা ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার দ্বারস্থ হয়েছিলেন, কিন্তু কোনো সাড়া পাননি। পরে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছেও লিখিত অভিযোগ জমা দেন নির্বাচনী অস্থিরতা ও হস্তক্ষেপের বিষয়ে।

সবশেষে আজকের ভোটই নির্ধারণ করবে বিসিবির পরবর্তী চার বছরের পথচলা। ক্রিকেট বোর্ডকে ঘিরে যে অব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতার অভাব ও ক্ষমতার লড়াই চলছে, তা নতুন নেতৃত্ব কতটা সামাল দিতে পারে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ঘরোয়া লিগের মানোন্নয়ন, নারী ক্রিকেটের উন্নয়ন, খেলোয়াড়দের বেতনভাতা, অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করা—এসব বড় চ্যালেঞ্জ সামনে আসবে। বুলবুলের অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক সংযোগ এই কাজগুলোতে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু বোর্ডের ভেতরের রাজনীতি সামলানো তার জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়াবে।

আজকের নির্বাচন তাই শুধু বিসিবির নয়, পুরো দেশের ক্রিকেট প্রশাসনের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ক্রিকেটপ্রেমীরা নজর রাখছেন সোনারগাঁও হোটেলের দিকে, যেখানে মাঠের বাইরে আরেকটি ম্যাচ হচ্ছে। এটি ব্যাট-বলের খেলা নয়, বরং ক্ষমতার লড়াই। আর এই লড়াইয়ের বিজয়ী হচ্ছেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল, যিনি আজ আনুষ্ঠানিকভাবে বিসিবির সভাপতির আসনে বসবেন। তার নেতৃত্বে আগামী চার বছর বাংলাদেশের ক্রিকেট কোন পথে যাবে, সেটিই এখন কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর কৌতূহলের বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত