শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা আজ: বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৯ বার
শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা আজ: বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আজ উদযাপিত হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা। আশ্বিনী পূর্ণিমা নামেও পরিচিত এই দিনটি আত্মশুদ্ধি, অশুভের বর্জন এবং সত্য ও সুন্দরকে বরণ করার এক অনন্য আয়োজন। সোমবার রাত ১১টা ৫৪ মিনিটে পূর্ণিমা তিথি শুরু হয়ে মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৩ মিনিট পর্যন্ত তা চলবে। এই বিশেষ পূর্ণিমা উপলক্ষে দেশের প্রতিটি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে, আর বিহারগুলোতে চলছে নানা ধর্মীয় আচার ও অনুষ্টান।

বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী, মহামতি গৌতম বুদ্ধ নির্বাণলাভের পর বর্ষাবাস পালন করেন আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত। তিন মাসব্যাপী সেই বর্ষাবাস শেষে আসে প্রবারণা তিথি। বুদ্ধের সময়কালে শত শত ভিক্ষু সংঘ একত্রে থেকে ধর্ম ও বিনয় শিক্ষা গ্রহণ করতেন এবং এই তিথিতেই তারা আত্মশুদ্ধি অর্জনের ব্রত গ্রহণ করে অশুভকে পরিত্যাগের অঙ্গীকার করতেন। সেই ধারাবাহিকতায় আজও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা একই আচার অনুসরণ করেন। প্রবারণা মূলত ভিক্ষু সংঘের জন্য বিনয়-কর্ম হিসেবে পরিচিত হলেও, সময়ের সঙ্গে এটি এক মহোৎসবে রূপ নিয়েছে, যা সাধারণ ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধদেরও অনুপ্রাণিত করে।

প্রবারণা পূর্ণিমা শেষে শুরু হয় বৌদ্ধদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব কঠিন চীবর দান। প্রতিবছর আষাঢ় মাসে প্রবারণার পরদিন থেকেই শুরু হয়ে এক মাসব্যাপী এই উৎসব দেশের প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারে পালিত হয়। কঠিন চীবর দান হলো ভিক্ষুদের জন্য নতুন চীবর প্রদানের এক মহা আচার, যা ভক্তদের কাছে সর্বোচ্চ ধর্মীয় দানের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। এ কারণেই প্রবারণা পূর্ণিমা শুধু একটি আধ্যাত্মিক উৎসব নয়, বরং কঠিন চীবর দানের মাধ্যমে এটি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বৃহত্তর সামাজিক ও ধর্মীয় মিলনমেলায় রূপ নেয়।

এ বছর প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে গত শনিবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বাণী দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বের সব বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, বর্তমান বিশ্বের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বুদ্ধের শিক্ষা বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। তার মতে, বুদ্ধের শান্তি, সহনশীলতা ও সত্যের শিক্ষা মানবতার সর্বজনীন কল্যাণে অপরিহার্য।

প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশন রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় আন্তর্জাতিক বৌদ্ধবিহারে দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। দিনব্যাপী এই আয়োজনের মধ্যে রয়েছে জাতীয় ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন, ভিক্ষু সংঘের প্রাতরাশ, মঙ্গলসূত্র পাঠ, বুদ্ধপূজা, পঞ্চশীল ও অষ্টাঙ্গ উপসথ শীল গ্রহণ, মহাসংসদান, অতিথি আপ্যায়ন, পবিত্র ত্রিপিটক থেকে পাঠ, আলোচনাসভা, প্রদীপ পূজা, আলোকসজ্জা, বিশ্বশান্তি কামনায় সম্মিলিত বুদ্ধোপাসনা, ফানুস উড্ডয়ন ও বুদ্ধকীর্তন। অনুষ্ঠানমালার প্রতিটি ধাপে জড়ো হন হাজার হাজার ভক্ত, যারা প্রার্থনা করেন শান্তি, সম্প্রীতি ও সুখী জীবনের জন্য।

বৌদ্ধদের মতে, প্রবারণা পূর্ণিমার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বুদ্ধের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই তিথিতেই তিনি তাবতিংস স্বর্গ থেকে অবতরণ করেন, যেখানে তিনি মাতৃদেবীর উদ্দেশ্যে অভিধর্ম দেশনা প্রদান করেছিলেন। এরপর ভারতের সাংকাশ্য নগরে অবতরণ করে তিনি মানবজাতির কল্যাণে ধর্ম প্রচারের দায়িত্ব ভিক্ষু সংঘকে অর্পণ করেন। এই দিনেই সমাপ্ত হয় তাঁর তিন মাসের বর্ষাবাস। এ কারণে প্রবারণা পূর্ণিমা ভিক্ষু সংঘের কাছে আত্মসমর্পণ ও আত্মশুদ্ধির প্রতীক হয়ে উঠেছে।

বৌদ্ধ লেখক ও গবেষক সুদর্শন বড়ুয়া বলেন, প্রবারণা মূলত আত্মশুদ্ধির উৎসব। আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস ভিক্ষুরা বর্ষাব্রত পালন করে থাকেন। এরপর আসে প্রবারণা, যার অর্থ আত্মসমর্পণ। এটি ভিক্ষু সংঘের বিনয়কর্ম হলেও পুরো সম্প্রদায়ের কাছে এটি আত্মশুদ্ধি, ঐক্য ও ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের বার্তা বহন করে। তিনি আরও বলেন, বুদ্ধের সময় থেকে শুরু হওয়া এই প্রথা আজও একই মর্যাদায় পালন করা হয় এবং বৌদ্ধ পল্লীগুলোতে এর অংশ হিসেবে ফানুস উত্তোলনের আয়োজন থাকে, যা আনন্দ ও শান্তির প্রতীক।

প্রবারণা পূর্ণিমা বাংলাদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্য কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বেরও প্রতীক। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বৌদ্ধ পল্লীতে এই দিনকে ঘিরে চলে আলোকসজ্জা, প্রদীপ জ্বালানো, প্রার্থনা সভা এবং সামাজিক মিলনমেলা। রাতভর চলে ধর্মগ্রন্থ পাঠ ও বুদ্ধকীর্তন। বহু পর্যটকও এসময় পাহাড়ি জেলা ও রাজধানীর বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারে ভিড় জমান, যা একদিকে ধর্মীয় আবহ তৈরি করে, অন্যদিকে সংস্কৃতি ও পর্যটনেও বিশেষ মাত্রা যোগ করে।

বিশ্বব্যাপী প্রবাসী বৌদ্ধ সম্প্রদায়ও প্রবারণা পূর্ণিমা পালন করে থাকে নানান আয়োজনে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতেও আয়োজন হয় বিশেষ প্রার্থনা, বুদ্ধপূজা ও আলোচনাসভার। এর মাধ্যমে প্রবাসী বৌদ্ধরা নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক শেকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার সুযোগ পান।

সব মিলিয়ে প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য এক পবিত্র দিন, যা শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং মানবতার কল্যাণ, শান্তি ও সত্যকে গ্রহণ করার এক মহৎ উপলক্ষ। আজকের এই দিনে বৌদ্ধ সম্প্রদায় আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে অশুভ ত্যাগ করে সত্য ও সুন্দরকে গ্রহণের অঙ্গীকার করবে, আর কঠিন চীবর দানের প্রস্তুতির মাধ্যমে আগামী এক মাসজুড়ে চলবে তাদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত