সিলেটে উদয়ন এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত: আতঙ্কের দুই ঘণ্টা পর স্বাভাবিক হয় রেল যোগাযোগ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫৪ বার
২৪ অক্টোবর থেকে বন্ধ হচ্ছে অন্যের টিকিটে ট্রেনযাত্রা

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সকালের শান্ত পরিবেশে সিলেটের মোগলাবাজার এলাকায় হঠাৎ ঘটে যায় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা। মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে সিলেটগামী উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনটি মোগলাবাজার স্টেশনের কাছাকাছি পৌঁছালে এর লোকোমোটিভসহ চারটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে। দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই সিলেটের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়, আর যাত্রীদের মধ্যে শুরু হয় আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা।

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকালে ট্রেনটি যখন মোগলাবাজার স্টেশনের দক্ষিণ প্রান্তে প্রবেশ করছিল, তখনই বিকট শব্দে বগিগুলো লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে। মুহূর্তেই থেমে যায় ট্রেনের গতি। যাত্রীরা আতঙ্কে চিৎকার শুরু করলে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং যাত্রীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেন। সৌভাগ্যবশত, এই দুর্ঘটনায় কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি, যদিও কয়েকজন যাত্রী সামান্য আহত হয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

সিলেট রেলওয়ের স্টেশন ম্যানেজার নুরুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানান, “উদয়ন এক্সপ্রেসের লোকোমোটিভসহ চারটি বগি মোগলাবাজার এলাকায় লাইনচ্যুত হয়। সঙ্গে সঙ্গে আমরা উদ্ধারকারী দলকে খবর দেই। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টার পর উদ্ধার অভিযান সম্পন্ন হয় এবং সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ট্রেন চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়।”

উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নেয় সিলেট ও আখাউড়া থেকে পাঠানো রেলওয়ের দুইটি উদ্ধারকারী দল। তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাইনচ্যুত বগিগুলো সরিয়ে রেললাইন মেরামতের কাজ সম্পন্ন করেন। এরপরই কালনী এক্সপ্রেস ট্রেনটি সিলেট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়, যা ছিল রেল চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার প্রথম প্রতীক।

দুর্ঘটনার পর এলাকায় বিপুলসংখ্যক কৌতূহলী মানুষ ভিড় জমায়। কেউ কেউ মোবাইল ফোনে ঘটনাস্থলের ভিডিও ধারণ করেন, যা মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। অনেকেই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের গাফিলতির অভিযোগ তোলেন। তাদের দাবি, রেললাইনগুলো পুরনো ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

তবে রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, রেললাইন কিছুটা দুর্বল বা অসম হয়ে পড়েছিল, যার ফলে ভারী ট্রেনের ধাক্কায় বগিগুলো লাইনচ্যুত হয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সিলেট রেলওয়ে বিভাগের প্রকৌশল শাখা দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ঘটনাটির কারিগরি দিক পরীক্ষা করছে।

রেলওয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। আমরা নিশ্চিত করতে চাই, যেন ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা আর না ঘটে।”

এদিকে, দুর্ঘটনায় পড়া যাত্রীদের অনেকে জানিয়েছেন, ট্রেনটি অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই ছিল এবং কিছু সময় ধরে ট্রেনের গতি অস্বাভাবিকভাবে দুলছিল। তারা মনে করছেন, সেটিও দুর্ঘটনার একটি কারণ হতে পারে। তবে কর্মকর্তারা বিষয়টি নিশ্চিত করেননি।

স্থানীয় মোগলাবাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জানান, “লাইনচ্যুতির খবর পেয়ে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে যাই। স্থানীয় লোকজন ও রেলওয়ের কর্মীরা মিলে উদ্ধার কাজে সহায়তা করেন। আল্লাহর রহমতে বড় ধরনের কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, তবে এই ধরনের দুর্ঘটনা রেল চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে।”

সিলেটবাসীর জন্য এই দুই ঘণ্টা ছিল এক চরম উৎকণ্ঠার সময়। সিলেট থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামগামী সব ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় যাত্রীদের ভোগান্তি চরমে ওঠে। অনেকে সিলেট রেলস্টেশনে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বাধ্য হন। সিলেটের রেলস্টেশন ম্যানেজার বলেন, “দুর্ঘটনার কারণে যাত্রীদের কিছুটা ভোগান্তি হয়েছে, তবে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় রেল চলাচল পুনরায় শুরু করতে পেরেছি।”

বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছোট-বড় মিলিয়ে লাইনচ্যুতির ঘটনা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেললাইন রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি, পুরনো সিগন্যাল সিস্টেম এবং অবকাঠামোর দুর্বলতা এর অন্যতম কারণ। তারা পরামর্শ দিচ্ছেন, রেলওয়ে ব্যবস্থায় নিয়মিত পরিদর্শন, আধুনিক সিগন্যাল প্রযুক্তি এবং জরুরি মেরামত কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এক যাত্রী লিখেছেন, “প্রতিবারই দুর্ঘটনা ঘটে, তদন্ত কমিটি হয়, কিন্তু ফলাফল আমরা কখনও জানতে পারি না। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার না করলে ভবিষ্যতে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”

এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় এখনো অনেক উন্নয়ন প্রয়োজন। দ্রুতগতির ট্রেন ও যাত্রীসেবার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। সিলেটের এই ঘটনাটি সামান্য প্রাণহানি ছাড়া শেষ হলেও, এটি রেল ব্যবস্থার দুর্বলতা ও ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করে—যা অবহেলা করা যাবে না।

দুই ঘণ্টার নাটকীয় উত্তেজনার পর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে যখন কালনী এক্সপ্রেস ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়, তখন সিলেটবাসী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। কিন্তু যাত্রীদের মনের গভীরে থেকে গেছে আতঙ্কের ছাপ—একটা প্রশ্ন এখন সবার মনে ঘুরছে, কবে আমরা নিরাপদ রেলযাত্রার নিশ্চয়তা পাব?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত