গাজীপুরের আতঙ্কের যুগ: ডিবি হারুনের নেতৃত্বে দুর্নীতি, দমন ও ভয়ংকর দুঃশাসনের ছায়া

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৯৫ বার

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের অন্যতম শিল্পনগরী গাজীপুর একসময় ছিল দেশের অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক। কিন্তু এই জেলার শিল্পপ্রবাহ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার আড়ালে চলেছিল এক ভয়ংকর দুঃশাসনের অধ্যায়—যেখানে পুলিশ, রাজনীতি ও অর্থের দাপটে সাধারণ মানুষ পরিণত হয়েছিল নিপীড়নের শিকার। সেই সময় গাজীপুরের শীর্ষে ছিলেন তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) হারুন অর রশিদ, যার নাম উচ্চারণ করলেই মানুষ ভয়ে কেঁপে উঠত।

‘ভাতের হোটেলওয়ালা’ নামে পরিচিত এই কর্মকর্তা গাজীপুরকে রূপ দিয়েছিলেন তার ব্যক্তিগত রাজ্যে। ঘুষ, চাঁদাবাজি, ভুয়া মামলা, ভয় দেখানো, রাজনৈতিক নিপীড়ন—সব কিছুই ছিল তার দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের অংশ। স্থানীয় ও জাতীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, তার নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনীর একটি চক্র শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষসহ অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।

স্থানীয়দের ভাষায়, হারুনের প্রভাব ছিল আইন-শৃঙ্খলার সীমা ছাড়িয়ে রাজনীতির সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলেই তিনি দাবি করতেন। এই সম্পর্কের জোরে তিনি নিজের অপকর্মের দায় এড়িয়ে চলতেন। এমনকি, স্থানীয়দের অভিযোগ—তিনি প্রায়ই বলতেন, “উপরেও তো দিতে হয়,” ইঙ্গিত দিতেন উচ্চ পর্যায়ের অংশীদারিত্বের দিকে।

শ্রীপুর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল বেপারী জানান, এসপি হারুনের আগমনের পর তার ব্যবসা ও ব্যক্তিজীবন ধ্বংস হয়ে যায়। টাকা দিতে না পারায় তাকে জমি বিক্রি করে দিতে বাধ্য করা হয়। একই অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন জেলার শত শত ব্যবসায়ী। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাতে ডিবি পুলিশের মাইক্রোবাসে করে টার্গেট করা ব্যক্তিদের ধরে নিয়ে যাওয়া হতো, ভোর পর্যন্ত ঘোরানো হতো “ক্রসফায়ারের ভয়” দেখিয়ে—তারপর টাকা নেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হতো।

এসপি হারুন গাজীপুরে অন্তত ১৫টি বিশেষ ডিবি টিম তৈরি করেছিলেন, যারা সন্ধ্যার পর অভিযান চালাত। রাজনৈতিকভাবে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো, জঙ্গি নাটক সাজানো, মাদক বা দেহব্যবসার অভিযোগে নিরীহ মানুষকে গ্রেপ্তার—সবই ছিল নিয়মিত ঘটনা।

ধর্মপ্রাণ মানুষদের অভিযোগ ছিল, হারুনের সময় গাজীপুরের আবাসিক হোটেলগুলোতে অবাধে দেহব্যবসা চলত। প্রতিটি হোটেল মালিককে দিতে হতো নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা। যারা অস্বীকার করত, তাদের বিরুদ্ধে চালানো হতো হয়রানি বা মাদক মামলার হুমকি। স্থানীয়রা ধর্মীয় অনুভূতি থেকে একাধিকবার প্রতিবাদ করলেও তাতে কোনো ফল হয়নি।

গাজীপুরে তার রাজত্বের সবচেয়ে ভয়ংকর অধ্যায় ছিল হাড়িনাল লেবুবাগান হত্যাকাণ্ড। সেখানে সাতজন শিক্ষার্থীকে গুলি করে হত্যা করা হয়, যাদের ‘জঙ্গি’ বলে প্রচার করা হয়েছিল। কিন্তু পরে জানা যায়, তারা সবাই ডুয়েট-এ ভর্তি প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এই হত্যাকাণ্ডে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী “সন্তোষ” প্রকাশ করলেও নিহতদের পরিবার আজও ন্যায়বিচার পায়নি। নিহত এক শিক্ষার্থীর বাবা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন, যা এখনও বিচারাধীন।

কালীগঞ্জ, শ্রীপুর ও পূবাইলসহ বিভিন্ন জায়গায় “জঙ্গি ধরার নাটক” সাজানো ছিল পুলিশের নিয়মিত কৌশল। এক বৃদ্ধ জানান, জমি বিক্রির টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ডিবি সদস্যরা তাকে থামিয়ে ব্যাগে ইয়াবা ঢুকিয়ে ‘ব্যবসায়ী’ বানায়। পরে সেই টাকা ছিনিয়ে নিয়ে ছেড়ে দেয়। সাংবাদিকরা বিষয়টি জানতে চাইলে হারুন টাকা ফেরত দেন—যা তার একমাত্র স্বীকারোক্তিপ্রাপ্ত ঘটনা।

হারুনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিল কুখ্যাত সন্ত্রাসী ‘মুচি জসিম’। কালিয়াকৈর ও শফিপুর শিল্পাঞ্চলে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করত সে, হারুনের প্রত্যক্ষ নির্দেশে। পরে হারুন বদলি হওয়ার পর জসিমকেও “ক্রসফায়ারে হত্যা” করা হয়।

এদিকে গাজীপুরের রাজনীতিতে তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকও ছিলেন আলোচিত ব্যক্তি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ৯৮৮ জন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় চাকরিচ্যুত করেছিলেন, যাদের সবাই বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলেন। বিচারপতি মানিকের মাধ্যমে “ফরমায়েশি রায়” এনে তাদের বরখাস্ত করা হয়। তবে ২০২৫ সালের জুনে আদালতের রায়ের মাধ্যমে তারা চাকরি ফিরে পান।

গাজীপুরবাসীর দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয় আরেক ভয়ংকর দুর্নীতি—বিআরটি প্রকল্প। বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত এই প্রকল্পের ভুল নকশা, ঠিকাদারি অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ১২ বছরেও শেষ হয়নি কাজটি। হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয়ের দায়ে তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকেও দায়ী করা হয়। স্থানীয়রা একে বলেন “গাজীপুরের দুর্নীতির স্মারক।”

আইনজীবী অ্যাডভোকেট সিদ্দিকুর রহমান জানান, আওয়ামী লীগের আমলে গাজীপুরের ৮ থানায় ও ৪ উপজেলায় গায়েবি মামলার হিড়িক পড়ে। কে কত মামলা করবে, কে কতজনকে গ্রেপ্তার করবে—তা নিয়ে চলত প্রতিযোগিতা। মোট ১ হাজারের বেশি মামলা ও ৫ হাজারেরও বেশি গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে।

বিরোধী দলীয় আন্দোলন দমনেও ভূমিকা ছিল গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকায় বিএনপির মহাসমাবেশে ডিবি প্রধান হারুনের সঙ্গে সমন্বয় করে তিনি প্রথম হামলার নেতৃত্ব দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলাতেও তার নাম আসে।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে মামলা করেছে। তদন্তে দেখা গেছে, ২৩টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভুয়া বিল উত্তোলন করে এই টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সোহেল হাসান বলেন, “বর্তমান প্রশাসন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অতীতের সব অনিয়ম আইনি প্রক্রিয়ায় তদন্ত হচ্ছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। উন্নয়ন ও ন্যায্যতার মাধ্যমেই আমরা জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে চাই।”

কিন্তু গাজীপুরের সাধারণ মানুষের জন্য এই আশ্বাস অনেকের কাছেই দেরিতে আসা ন্যায়বিচারের প্রতিধ্বনি মাত্র। শহরের প্রাচীর, রাস্তা ও মানুষের মুখে এখনও শোনা যায় আতঙ্কের সেই দিনগুলোর স্মৃতি—যখন আইন ছিল ক্ষমতার হাতের খেলনা, আর গাজীপুরের বাতাসে ছিল ভয়, প্রতারণা ও নিপীড়নের গন্ধ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত