নির্বাচন নিয়ে সিইসির কঠোর হুঁশিয়ারি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ২৭ বার
নির্বাচন নিয়ে সিইসির কঠোর হুঁশিয়ারি:

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রশাসনিক ও মাঠপর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা যেন দলীয় আচরণ বা পক্ষপাতমূলক মনোভাব প্রকাশ না করতে পারেন—এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সম্মেলন কক্ষে নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এই সতর্কবার্তা দেন। তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কেউ যদি দলীয় মনোভাব দেখান, তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সিইসি নাসির উদ্দিন বলেন, “নির্বাচনের সময় কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি দলীয় মনোভাব পোষণ করেন, দলীয় আচরণ করেন বা কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের হয়ে কাজ করেন—তাহলে আমরা তাকে ছাড় দেব না। আমরা কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেব। আগে এমন একটা সংস্কৃতি ছিল যে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ থাকত—একটা নির্দিষ্ট দলের হয়ে কাজ করতে হবে। এখন সেই সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। এবার মেসেজ একটাই—যে কোনো পক্ষের হয়ে কাজ করলে তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের দেশে আগে বার্তা দেওয়া হতো, ‘আমার পক্ষে কাজ না করলে তোমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ কিন্তু এখন আমরা স্পষ্টভাবে বলছি—‘তুমি যদি কোনো পক্ষের হয়ে কাজ করো, তাহলে তোমার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এটা আমরা শুধু বলেই থামব না, প্রয়োজনে বাস্তবে প্রয়োগও করব।”

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানান, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা। এজন্য মাঠ প্রশাসন ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, “আগে অনেক সময় মাঠের কর্মকর্তাদের রাতে গিয়ে প্রভাবিত করা হতো, ভয় দেখানো হতো কিংবা নানা উপায়ে প্ররোচিত করা হতো। এবার সেই সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। আমরা নিশ্চিত করবো যেন কোনো ধরনের ভয়, চাপ বা রাজনৈতিক প্রভাব তাদের ওপর কাজ না করে।”

নাসির উদ্দিন বলেন, “নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করবে এবং প্রয়োজনে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ ঘটাবে। আমরা নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রতি বার্তা দিতে চাই—আপনাদের কাজ হলো রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য দেখানো, কোনো দল বা গোষ্ঠীর প্রতি নয়।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, নির্বাচনের সময় মাঠপর্যায়ের প্রশাসন—যেমন রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যাতে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করেন, তা নিশ্চিত করতে কমিশন ইতোমধ্যেই নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। কমিশন প্রয়োজন মনে করলে কর্মকর্তাদের বদলিতেও দ্বিধা করবে না।

সভায় উপস্থিত নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলেন, পূর্ববর্তী অনেক নির্বাচনে কর্মকর্তাদের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব বা চাপের কারণে তারা নিরপেক্ষ থাকতে পারেননি। এজন্য কমিশনের এই উদ্যোগ নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।

সভায় নির্বাচন কমিশনের চারজন কমিশনার ও ইসি সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মতবিনিময় সভায় অংশ নেন ১০ জন সাবেক নির্বাচন কর্মকর্তা, যারা কমিশনের কাজের পদ্ধতি নিয়ে নানা পরামর্শ দেন। তারা বলেন, শুধু নীতিগত ঘোষণা দিলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

সিইসি নাসির উদ্দিন বলেন, “আমরা চাই, দেশের মানুষ দেখুক—এবারের নির্বাচন সত্যিই স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য আয়নার মতো স্বচ্ছ একটি নির্বাচন উপহার দেওয়া। কোনো ধরনের কারচুপি, ভয়ভীতি বা প্রভাব যেন না থাকে—সেটিই হবে আমাদের সাফল্যের মাপকাঠি।”

তিনি জানান, নির্বাচন কমিশন বর্তমানে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্বাচনকালীন আচরণবিধি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রশিক্ষণে মূলত তিনটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে—নিরপেক্ষতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ।

সিইসি বলেন, “আমরা জানি, মাঠপর্যায়ে অনেক সময় নানা রকম চাপ আসে। কিন্তু এবার আমরা প্রতিটি স্তরে এমন একটা বার্তা দিতে চাই, যেন কেউ চাপের মুখে পড়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করেন। কমিশন কর্মকর্তাদের পাশে থাকবে এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।”

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, কমিশন ইতোমধ্যে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করেছে। নির্বাচনকালীন সময়ে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়োগ, বদলি এবং দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে এখন থেকে কমিশনের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কোনো পক্ষ যেন প্রশাসনিকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা হবে।

সভায় অংশ নেওয়া একজন সাবেক নির্বাচন কমিশনার বলেন, “সিইসির বক্তব্য অত্যন্ত সময়োপযোগী। জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে ঘোষণার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এর বাস্তবায়ন। অতীতে এমন ঘোষণা আমরা অনেকবার শুনেছি, কিন্তু মাঠে তা কার্যকর হয়নি। এবার জনগণ বাস্তবে দেখতে চায়, নির্বাচন কমিশন সত্যিই স্বাধীনভাবে কাজ করছে।”

অন্য একজন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ বলেন, “দেশে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন এখন সময়ের দাবি। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জনগণের মধ্যে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে হলে কমিশনকে নিরপেক্ষতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।”

সিইসি নাসির উদ্দিন সভার শেষভাগে আরও বলেন, “আমরা কেউই কোনো দলের লোক নই। আমরা রাষ্ট্রের কর্মচারী। তাই আমাদের কাজ রাষ্ট্রের পক্ষে, জনগণের পক্ষে। কোনো রাজনৈতিক পক্ষের হয়ে কাজ করা মানে সংবিধানের শপথ ভঙ্গ করা। কেউ যদি সেটা করেন, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।”

তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবার নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হবে, যেখানে ভোটাধিকার সত্যিকারের অর্থে জনগণের হাতে থাকবে এবং নির্বাচনী প্রশাসন থাকবে দলমুক্ত, প্রভাবমুক্ত ও ভয়ের ঊর্ধ্বে।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, আসন্ন নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার, ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা জোরদার, পর্যবেক্ষকদের স্বাধীন চলাচল এবং ফলাফল ঘোষণায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতের বিষয়েও কমিশন কাজ করছে।

অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সিইসির এই বক্তব্য নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বিশ্বাসযোগ্য করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তারা বলছেন, নির্বাচনের সময় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আচরণই প্রমাণ করবে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে।

সভায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা সর্বশেষ একমত হন যে, নির্বাচনী পরিবেশকে মুক্ত, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করতে হলে কমিশনকে কঠোরভাবে তার নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে এবং রাজনৈতিক চাপ বা প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করতে হবে।

সবশেষে সিইসি বলেন, “আমরা চাই জনগণ বিশ্বাস করুক—তাদের ভোটের মূল্য আছে। আমরা এমন একটি নির্বাচন আয়োজন করবো যেখানে প্রত্যেক ভোট গণনা হবে এবং ফলাফল নির্ভুলভাবে প্রতিফলিত হবে। সেটিই হবে আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় সাফল্য।”

বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের এই ঘোষণা ও অঙ্গীকার আগামী জাতীয় নির্বাচনের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা ও আস্থা নতুন করে জাগিয়ে তুলবে কিনা—সেটিই এখন দেশের রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তবে কমিশনের সর্বশেষ বক্তব্যে স্পষ্ট বার্তা পাওয়া গেছে—কেউ দলীয় আচরণ করলে ছাড় নেই, আর নিরপেক্ষতার প্রশ্নে কোনো আপসও নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত