শহিদুলসহ ফ্লোটিলার আটক যাত্রীরা নিরাপদে আছেন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬০ বার
শহিদুলসহ ফ্লোটিলার আটক যাত্রীরা নিরাপদে আছেন

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে যাত্রা করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার উদ্যোগ ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা’ আবারও ইসরাইলি বাহিনীর হাতে আটক হয়েছে। আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে আটক হওয়া এই নৌবহরের যাত্রীদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট ফটোগ্রাফার, মানবাধিকারকর্মী ও লেখক শহিদুল আলম। ইসরাইলের দখলদার বাহিনী জানিয়েছে, আটক সব যাত্রীই সুস্থ ও নিরাপদে আছেন। তবে এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে।

ফ্রিডম ফ্লোটিলা ছিল গাজার অবরুদ্ধ জনগণের জন্য বহুল প্রত্যাশিত একটি মানবিক উদ্যোগ। প্রায় নয়টি জাহাজ নিয়ে গঠিত এই বহরটি ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, চিকিৎসক ও সহায়তাকর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল—গাজায় ত্রাণ, ওষুধ, খাদ্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া, যা দীর্ঘদিনের ইসরাইলি অবরোধের কারণে অত্যন্ত সংকটে রয়েছে।

ইসরাইলি গণমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইল জানায়, বুধবার সকালে নৌবহরটি যখন গাজার উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন ইসরাইলি নৌবাহিনী সেটি ঘিরে ফেলে। সামরিক হেলিকপ্টার এবং যুদ্ধজাহাজ দিয়ে ফ্লোটিলার পথরোধ করা হয়। পরবর্তীতে জাহাজগুলোতে ওঠে ইসরাইলি সেনারা এবং যাত্রীদের আটক করে তাদের জাহাজগুলোসহ একটি ইসরাইলি বন্দরে নিয়ে যায়।

ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (পূর্বে টুইটার) জানায়, “গাজায় আরোপিত নৌ অবরোধ ভাঙার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ফ্রিডম ফ্লোটিলার সব যাত্রী বর্তমানে নিরাপদে আছেন। তাদের দ্রুত নিজ নিজ দেশে নির্বাসিত করা হবে।” একই সঙ্গে ইসরাইল এই অভিযানের যৌক্তিকতা তুলে ধরে দাবি করেছে যে, এই ফ্লোটিলার উদ্দেশ্য ছিল ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করা’ এবং ‘ইসরাইলি আইন লঙ্ঘন করা’।

অন্যদিকে, ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, “আমরা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে মানবিক ত্রাণ পৌঁছে দিতে গাজায় যাচ্ছিলাম। আমাদের ওপর ইসরাইলি বাহিনীর আক্রমণ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের এক নগ্ন উদাহরণ।” তাদের দাবি, নৌবহরটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকাকালীনই ইসরাইলি বাহিনী হেলিকপ্টার থেকে হামলা চালায় এবং পরবর্তীতে অস্ত্রের মুখে জাহাজ দখল করে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “ইসরাইলি বাহিনী আমাদের জাহাজ অবৈধভাবে আটক করেছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। এটি মানবিক উদ্যোগের ওপর সরাসরি সামরিক আক্রমণ।”

বাংলাদেশের মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম এই মিশনের অন্যতম আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পূর্ববর্তী পোস্টগুলোতে দেখা যায়, তিনি ইতালির বন্দর থেকে যাত্রার সময় মানবিক সহায়তা এবং শান্তির বার্তা নিয়ে গাজার উদ্দেশে রওনা দেন। তার অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়, কারণ এটি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মানবতার এক সাহসী কণ্ঠস্বর হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।

ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি ঠিক কোন বন্দরে আটক যাত্রীদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে টাইমস অব ইসরাইল সূত্রে জানা গেছে, আটক নৌবহরটি সম্ভবত আশদোদ বন্দরে নেওয়া হয়েছে, যেখানে তাদের নিরাপত্তা জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দ্রুত নির্বাসনের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

এই ঘটনার পর জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল এক বিবৃতিতে বলেছে, “মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনে বৈধ। ইসরাইলের এই পদক্ষেপ গাজায় চলমান মানবিক সংকটকে আরও গভীর করবে।”

একইভাবে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে যে, “ইসরাইলের এই আচরণ মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। মানবিক সহায়তাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা এক অমানবিক কাজ।”

গাজা গত ১৭ বছর ধরে ইসরাইলি অবরোধের মধ্যে রয়েছে। বিদ্যুৎ, খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র ঘাটতি সেখানে একটি স্থায়ী মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক সংঘাতে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত এবং লক্ষাধিক বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ফ্রিডম ফ্লোটিলার যাত্রা অনেকের কাছে ছিল আশা ও মানবতার প্রতীক।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইসরাইলের এই পদক্ষেপ তার আগের একাধিক নৌ-অবরোধ ঘটনার পুনরাবৃত্তি। ২০১০ সালে গাজায় যাওয়ার পথে মাভি মারমারা নামের এক তুর্কি জাহাজে ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় ১০ জন মানবাধিকারকর্মী নিহত হয়েছিলেন। সেই ঘটনার পরও আন্তর্জাতিক ক্ষোভের মুখে ইসরাইল অবরোধনীতি পরিবর্তন করেনি।

ঢাকা থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, “আমরা আমাদের নাগরিক শহিদুল আলমের বিষয়ে অবগত আছি এবং ইতোমধ্যে তেল আবিবে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষাকারী দূতাবাসের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, তিনি সুস্থ ও নিরাপদে আছেন।”

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। রাজধানী ঢাকায় বেশ কয়েকটি সংগঠন শহিদুল আলমসহ আটক যাত্রীদের মুক্তির দাবি জানিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে।

ইসরাইলের নৌ অবরোধ দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত। ইসরাইল দাবি করে, এটি হামাসের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই অবরোধ প্রকৃতপক্ষে এক ধরণের ‘সমষ্টিগত শাস্তি’, যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী।

এই ঘটনার ফলে ফ্রিডম ফ্লোটিলা আবারও বিশ্বমঞ্চে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাপী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘#FreeTheFlotilla’ হ্যাশট্যাগে তুমুল প্রচারণা শুরু হয়েছে। গাজার অবরোধ ভাঙার শান্তিপূর্ণ প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানিয়ে লাখো মানুষ ইসরাইলের নিন্দা করছে এবং মানবিক সহায়তার পথ উন্মুক্ত করার আহ্বান জানাচ্ছে।

ফ্রিডম ফ্লোটিলা আন্দোলনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ববাসীর দৃষ্টি গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ফেরানো। তাদের দাবি, “আমরা শুধু ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছিলাম, কিন্তু ইসরাইল আমাদের থামিয়ে দিল। এতে বোঝা যায়, গাজার মানুষের প্রতি নিষ্ঠুরতা কত গভীর।”

বর্তমানে আটক ফ্লোটিলা যাত্রীদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্বের অন্তত ২৫টি দেশের নাগরিক। তাদের মধ্যে রয়েছেন চিকিৎসক, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, এমনকি সাবেক সংসদ সদস্যও। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “যাত্রীদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দ্রুত তাদের নিজ নিজ দেশে পাঠানো হবে।”

বিশ্ববাসী যখন গাজায় মানবিক বিপর্যয় লাঘবে আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানাচ্ছে, ঠিক সেই সময় ফ্রিডম ফ্লোটিলার আটক হওয়া যেন মানবতার প্রতি এক বড় আঘাত। তবুও, এই মিশন প্রমাণ করে দিয়েছে—মানুষ এখনো অন্য মানুষের কষ্টে পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত, এমনকি নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেও।

ফ্রিডম ফ্লোটিলার এই অভিযান হয়তো থেমে গেছে, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য—মানবতার জয়—আজও বিশ্বের বিবেককে নাড়া দিচ্ছে। গাজার আকাশে এখনও ধোঁয়া, তবে মানবতার আলো নিভে যায়নি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত