প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ত্রাণসহ গাজার উদ্দেশ্যে যাত্রা করা ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের সব জাহাজ ইসরাইলি সেনাবাহিনী দ্বারা আটক করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক জলসীমায় অভিযান চালিয়ে জাহাজগুলোকে নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়। আটক যাত্রীদের মধ্যে বাংলাদেশের ফটোগ্রাফার ও লেখক শহিদুল আলমসহ বিভিন্ন দেশের মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, ডাক্তার এবং সক্রিয় অধিকারকর্মীরা রয়েছেন। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আটক যাত্রীরা সকলেই সুস্থ্য ও নিরাপদে রয়েছেন এবং তাদের দ্রুত রিলিজ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
এফএফসি সূত্রে জানা গেছে, বুধবার তিনটি ছোট জাহাজে ইসরাইলি বাহিনী আক্রমণ চালিয়েছে। এদের মধ্যে প্রথমে ‘দ্য কনশেনস’ নামের একটি জাহাজ লক্ষ্য করা হয়। এই জাহাজে সাংবাদিক, ডাক্তার ও মানবাধিকারকর্মীসহ ৯৩ জন যাত্রী ছিলেন। হামলার পর তাদের আটক করে অজ্ঞাত স্থানে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে নৌবহরের অন্যান্য জাহাজগুলোও ইসরাইলি সেনার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
ইসরাইলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গাজার উপরে আরোপিত সমুদ্র অবরোধ ভেঙে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তাদের জাহাজ ও যাত্রীদের একটি ইসরাইলি বন্দরে নেওয়া হয়েছে। সকল যাত্রী নিরাপদ এবং সুস্থ আছেন। সরকার আশা করছে, খুব শীঘ্রই তাদের মুক্তি দেওয়া সম্ভব হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “নৌবহরকে আটক করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। যাত্রীদের জীবন ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে নেই।”
ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের নৌবহরে মোট নয়টি জাহাজ রয়েছে। দুই সপ্তাহ আগে ইতালি থেকে যাত্রা শুরু করে এই নৌবহর। এফএফসি জানায়, জাহাজগুলো মূলত গাজার ত্রাণ, খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহের জন্য রওনা হয়েছিল। অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল অবরোধের কারণে দারিদ্র্য ও সংকটে থাকা গাজার মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম এই অভিযানকে মানবিক উদ্দেশ্য বলে উল্লেখ করেছে।
এফএফসি আরও জানিয়েছে, আটক অবস্থায় থাকা যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা হচ্ছে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ইসরাইলি হামলার আগে জাহাজগুলো শান্তিপূর্ণভাবে যাত্রা করছিল এবং কোনো সহিংসতা সংঘটিত হয়নি। এই নৌবহর ছিল পুরোপুরি মানবিক উদ্যোগের অংশ, যাতে গাজার জনগণ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও খাদ্য সামগ্রী পেতে পারে।
টাইমস অব ইসরাইল জানায়, আটক জাহাজগুলোকে ইসরাইলি বন্দরে স্থানান্তর করার আগে এদের উপর নজরদারি চালানো হয়। ফ্লোটিলার অভিযানের নেতৃত্বে থাকা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক জলসীমায় এই ধরনের অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও মানবিক সাহায্য প্রদান ও নৌবহরের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
এফএফসি উল্লেখ করেছে, এই অভিযান ইসরাইলের সামুদ্রিক অবরোধকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পরিচালিত হয়েছে। তাদের লক্ষ্য ছিল গাজার মানুষকে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। জাহাজগুলোতে থাকা মানবাধিকারকর্মী, ডাক্তার ও সাংবাদিকরা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং মানবিক সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার কাজ দেখার জন্য ছিলেন।
ইসরাইলি বাহিনীর এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থা বিভিন্নভাবে সমালোচনা করেছে। আল জাজিরা জানায়, আটককৃত নৌবহরের যাত্রীরা ন্যায্য ও মানবিক উদ্দেশ্যে চলছিলেন, কিন্তু ইসরাইলের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা তাদের গাজার উদ্দেশ্যে যাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ বারবার বলছে, তাদের প্রধান উদ্দেশ্য অবরোধ ভেঙে প্রবেশের চেষ্টা রোধ করা।
নৌবহরের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আটক অবস্থায় থাকা প্রতিটি জাহাজ ও যাত্রীর পরিস্থিতি মনিটর করা হচ্ছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের মুক্তি প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আটক যাত্রীদের নিরাপদে গাজার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে।
ফ্রিডম ফ্লোটিলার অভিযান মানবিক ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যকে সামনে রেখে পরিচালিত হলেও, এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নৌ নিরাপত্তা সংক্রান্ত জটিলতা তুলে ধরেছে। ইসরাইলের কঠোর পদক্ষেপ, ফ্লোটিলার আটক এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে এটি মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মানবিক সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরছে।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও স্পষ্ট হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় মানবিক সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা শুধুমাত্র ত্রাণ বিতরণ নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত একটি জটিল প্রক্রিয়া। ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন জানিয়েছে, তারা ভবিষ্যতে এ ধরনের মানবিক অভিযান অব্যাহত রাখার জন্য প্রস্তুত।